বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা পবিত্র রমজান মাস পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখা হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এটি ইবাদত-বন্দেগি, আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও দান-খয়রাতের বিশেষ সময়। একই সঙ্গে এটি সামাজিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সূর্যাস্তের পর পরিবার ও বন্ধুরা একত্রে ইফতার করে রোজা ভাঙেন।
রমজান শেষে উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর, যা ইসলামের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব।

রমজান কবে শুরু হতে পারে
রমজান ইসলামি চান্দ্রবর্ষের নবম মাস। এই ক্যালেন্ডার ঋতুচক্রের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আসে। নতুন চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের শুরু নির্ধারণ করা হয়।
এ বছর রমজান সম্ভাব্যভাবে ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারির দিকে শুরু হতে পারে। তবে চাঁদ দেখার পদ্ধতি ও হিসাবের ভিন্নতার কারণে দেশভেদে শুরুর তারিখ কিছুটা আলাদা হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ বছর রমজানের সম্ভাব্য শুরু খ্রিস্টানদের লেন্ট ঋতুর সূচনাদিবস অ্যাশ ওয়েডনেসডের সময়ের কাছাকাছি পড়তে পারে। লেন্ট হলো অনেক খ্রিস্টানের কাছে উপবাস ও অনুতাপের এক গম্ভীর ধর্মীয় সময়।

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি রোজা
রমজানের রোজা ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। অন্য চারটি হলো ঈমানের ঘোষণা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জাকাত প্রদান এবং মক্কায় হজ পালন।
মুসলমানদের কাছে রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়; এটি আত্মসংযম, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায়। রোজা ধৈর্য শেখায়, কৃতজ্ঞতা বাড়ায় এবং দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।
রমজানজুড়ে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খাবার ও পানীয়, এমনকি পানিও পরিহার করা হয়। সূর্যাস্তের পর ইফতার দিয়ে রোজা ভাঙা হয়। আর ভোরের আগে অনেকেই সেহরি খেয়ে দিনের প্রস্তুতি নেন।
এ মাসে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। জামাতে নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত ও দীর্ঘ সময় ইবাদতে মগ্ন থাকার চিত্র দেখা যায়।
দান-সদকার গুরুত্বও এ সময়ে বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেকেই অসহায়দের মাঝে খাদ্য বিতরণ করেন, ইফতারের আয়োজন করেন বা কমিউনিটি পর্যায়ে বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেন।

কারা রোজা থেকে অব্যাহতি পান
ইসলামে বৈধ কারণ থাকলে রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। যেমন অসুস্থতা বা সফরে থাকলে রোজা থেকে ছাড় দেওয়া হয়। যাঁরা সাময়িক কারণে রোজা রাখতে পারেন না, তাঁদের পরে সেই রোজা কাজা করে নেওয়ার বিধান রয়েছে।
সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যে রমজান
রোজা ধর্মীয় ফরজ হলেও রমজানকে ঘিরে নানা সাংস্কৃতিক রীতি গড়ে উঠেছে, যা অঞ্চলভেদে ভিন্ন। তবে সূর্যাস্তের পর পারিবারিক ও সামাজিক সমাবেশ প্রায় সর্বত্রই সাধারণ দৃশ্য।
অনেক পরিবার ঘর সাজান রমজান-থিমের সজ্জায়। বাজার ও বিশেষ হাটগুলোতেও এ সময়ে বাড়তি ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

মিসরে রমজান এক উৎসবমুখর আবহ তৈরি করে। ঘরবাড়ি ও রাস্তায় রঙিন ফানুস ঝুলানো হয়, ঐতিহ্যবাহী গান দিয়ে রমজানকে স্বাগত জানানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিনের একটি প্রথা হলো ‘মেসাহারাতি’। তিনি ভোরের আগে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঢোল বাজিয়ে মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে দেন।
কিছু দেশে টেলিভিশন অনুষ্ঠানও রমজানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন নাটক প্রচার হয়, বিজ্ঞাপনদাতারা দর্শক টানতে প্রতিযোগিতা করেন। কেউ কেউ মনে করেন, অতিরিক্ত বাণিজ্যিক আয়োজন ও জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার মাহফিল রমজানের আধ্যাত্মিক দিককে আড়াল করতে পারে। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক আয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব।
ইন্দোনেশিয়ায় রমজান পালনে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য স্পষ্ট। আচেহ প্রদেশে ‘মেউগাং’ নামে একটি প্রথায় পরিবারগুলো পশু জবাই করে আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের মধ্যে মাংস বিতরণ করে। জাকার্তার কাছে তাঙ্গেরাংয়ে অনেকে সিসাদানে নদীর তীরে সমবেত হয়ে প্রতীকী শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সুমাত্রার কিছু এলাকায় সন্ধ্যার নামাজের পর শিশু-কিশোররা মশাল হাতে শোভাযাত্রা বের করে ও ইসলামি গান গায়।

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানরা একটি বৈচিত্র্যময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সেখানে অনেক পরিবার মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে ইফতার ও নামাজে অংশ নিয়ে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করেন। কিছু এলাকায় আন্তধর্মীয় ইফতার আয়োজনও করা হয়, যা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংহতি বাড়াতে সহায়তা করে।
ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও রমজান বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য ইবাদত, উদারতা ও সম্মিলিত অভিজ্ঞতার এক অনন্য সময় হিসেবে থেকে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















