সিঙ্গাপুরে অবস্থিত Interpol–এর সাইবার অপরাধ দমন কেন্দ্র এখন কার্যত এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে দিনরাত বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন পরবর্তী বড় মুক্তিপণ আদায় হামলা কিংবা পরিচয় জালিয়াতি কেলেঙ্কারি।
সংস্থাটির এই কমপ্লেক্সটি Singapore–এ অবস্থিত এবং এটি ফ্রান্সের Lyon–এর পর ইন্টারপোলের দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয় হিসেবে কাজ করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সবচেয়ে বড় হুমকি
ইন্টারপোলের সাইবার অপরাধ বিভাগের পরিচালক নিল জেটন জানিয়েছেন, সাইবার অপরাধীদের হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। তাঁর কথায়, অপরাধীরা যেভাবে পারছে, সেভাবেই এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে।
নিখুঁত বানানের ফিশিং ইমেল থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের ভুয়া ভিডিও—সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রও এখন ঝুঁকির মুখে।
জেটনের মতে, সাইবার হামলার ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই আক্রমণের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই মানুষকে সচেতন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

অদৃশ্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে হ্যাকিং সরঞ্জাম
তিনি আরও জানান, অদক্ষ অপরাধীরাও এখন গোপন অনলাইন জগতে প্রস্তুত হ্যাকিং ও প্রতারণার সরঞ্জাম কিনতে পারছে। একটি স্মার্টফোন থাকলেই যে কেউ টার্গেট হতে পারে।
এই কেন্দ্রের সাইবার ফিউশন ইউনিটে ১৯৬টি সদস্য দেশের মধ্যে অনলাইন হুমকি সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান হয়। পাশাপাশি রয়েছে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, যেখানে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এমনকি গাড়ি থেকেও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
বিশাল পর্দায় সাজানো কমান্ড সেন্টারে এশীয় সময় অনুযায়ী বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। লক্ষ লক্ষ ওয়েব ঠিকানা, ক্ষতিকর সফটওয়্যার ও হ্যাকারদের পরিচয় বিশ্লেষণ করে তদন্তে নতুন সূত্র খোঁজা হয়।
বিস্তৃত অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াই
সাইবার গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়কারী ক্রিশ্চিয়ান হেগেন বলেন, তারা এক বিশাল অপরাধী ইকোসিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়ছেন। চুরি হওয়া তথ্য বিক্রি, নজরদারি বাণিজ্য, ক্ষতিকর সফটওয়্যার কেনাবেচা—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অন্ধকার বাজার।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইন্টারপোল আর্থিক খাত, সাইবার নিরাপত্তা ও ক্রিপ্টো বিশ্লেষণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক অভিযানে বড় সাফল্য
২০২৫ সালে এশিয়ায় পরিচালিত ‘অপারেশন সিকিউর’ অভিযানে ২৬টি দেশ একসঙ্গে কাজ করে ২০ হাজারের বেশি ক্ষতিকর ইন্টারনেট ঠিকানা ও ডোমেইন বন্ধ করে দেয়।
আফ্রিকায় ‘অপারেশন সেরেঙ্গেটি ২.০’ অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ২০৯ জন সাইবার অপরাধী। প্রায় ৮৮ হাজার ভুক্তভোগীকে টার্গেট করা এই চক্রের কাছ থেকে ৯৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উদ্ধার হয় এবং ১১ হাজারের বেশি অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধেও তথ্য আদানপ্রদান ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সহায়তা দিয়েছে ইন্টারপোল।
ডিপফেক থেকে নিয়ন্ত্রণহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ইন্টারপোল উদ্ভাবন কেন্দ্রের প্রধান তোশিনোবু ইয়াসুহিরা জানান, ডিপফেক প্রযুক্তির অগ্রগতি বড় উদ্বেগের কারণ। তবে তাঁর আরও বড় দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, অপরাধে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য দায়ী কে—প্রোগ্রামার, ব্যবহারকারী, নাকি প্রযুক্তি নিজেই?
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ পাওলো নরোনহা জানান, তদন্তকারীদের এগিয়ে রাখতে ভার্চুয়াল বাস্তবতা, বর্ধিত বাস্তবতা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
![]()
নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ
এই লড়াই সাধারণ মানুষের চোখে খুব কমই আসে। তবে বিশ্ব নিরাপত্তা রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক গোয়েন্দা বিশ্লেষক বলেন, তারা যতটা সম্ভব গোপনীয়তা বজায় রেখে বিশ্বজুড়ে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















