বাংলা ভাষার প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক মনিশংকর মুখার্জি শুক্রবার দুপুরে কলকাতায় মারা গেছেন। সাহিত্য জগতে তিনি ‘শংকর’ নামেই পরিচিত ছিলেন।
মৃত্যুর সময়ে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। একাধিক শারীরিক সমস্যা নিয়ে তিনি সপ্তাহ দুয়েক আগে দক্ষিণ কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর আগে ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাকে, সেবার অস্ত্রোপচারও করা হয়।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন লেখক, পরে এমাসের গোড়ায় আবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
“সেখানেই আজ দুপুর পৌনে একটা নাগাদ তার মৃত্যু হয়,” জানিয়েছেন শংকরের লেখা অধিকাংশ বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা ‘দেজ পাবলিশিং’এর প্রধান সুধাংশু শেখর দে।
তার মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সহ বিশিষ্ট জনেরা। মুখ্যমন্ত্রী তার শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জন অরণ্য’—মনিশংকর মুখার্জির (শংকর) কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে।
তার ‘চৌরঙ্গী’ বা ‘স্বর্গ মর্ত পাতাল’ এর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় বইগুলির কোনোটি ১২৮, কোনোটির একশরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে লক্ষ লক্ষ কপি।
মনিশংকর থেকে শুধুই শংকর

শংকরের লেখা ‘সীমাবদ্ধ আর জন অরণ্য’ চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছেন সত্যজিৎ রায় – ফাইল ছবি
মণিশংকর মুখার্জির জন্ম ১৯৩৩ সালে বনগ্রাম বা বনগাঁয়।
নিজেকে তিনি ‘বাঙাল ফ্রম বনগ্রাম’ বলতেন।
সেখান থেকে তার পরিবার চলে আসে কলকাতা লাগোয়া হাওড়া শহরে। হাওড়ার কথা তার উপন্যাসগুলিতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে।
খুব কম বয়সে, ১৯৪৭ সালে পিতৃহারা হয়ে জীবনযুদ্ধে নামতে হয় তাকে। নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ করা।
সেই অফিসে কাজ করতে গিয়েই নিজের নামটাও চিরতরে বদলিয়ে গিয়েছিল। ‘মনিশংকর’ – এত বড়ো খটোমটো নাম ব্যারিস্টারের উচ্চারণ করতে সমস্যা হচ্ছিল, তাই ছোট করে ‘শংকর’ নাম দিয়েছিলেন।
শংকরের প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’-র পটভূমিও ছিল সেই ব্যারিস্টারের কাছে তার কর্মজীবনকে ঘিরেই। সেটা ছিল ১৯৫৫ সাল।
ওই প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’-এ। সেই ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনিশংকর মুখার্জী লিখেছিলেন যে কারও সঙ্গে গিয়ে উপন্যাসটি জমা দিয়েছিলেন ‘দেশ’ পত্রিকার প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে।
পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে সাগরময় ঘোষ বলেছিলেন, অন্তত সপ্তাহতিনেক যেন তাকে এ নিয়ে আর বিরক্ত না করা হয়।
বেশ কিছুদিন উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষার পরে একদিন মনিশংকর পৌঁছিয়েই গিয়েছিলেন পত্রিকা দফতরে।
সাগরময় ঘোষ তাকে বলেছিলেন, তিনি নাকি লেখকের খোঁজ করে চলেছেন, কিন্তু ‘ঠিকানাটুকুও তো দেন নি!’ লেখক।
ওই উপন্যাস প্রকাশিত হতেই হইহই শুরু হয়ে যায়। তবে তার কাছেই শুনেছিলাম যে প্রথম উপন্যাস বেরোনোর পরে অনেকেই নাকি তাকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, তিনি ‘একটি উপন্যাসের লেখক’, অর্থাৎ কোনোভাবে একটা ভাল উপন্যাস বেরিয়ে গেছে তার হাত দিয়ে।
কিন্তু পরবর্তীতে তার উপন্যাস যে লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হবে, তা বোধহয় সেই শুরুর দিকের সমালোচকরা আন্দাজও করতে পারেন নি।
কয়েকবছর পরে তিনি লিখেছেন আরেক কালজয়ী উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’। তা পরে রূপ পেয়েছে একই নামের চলচ্চিত্রে, যেখানে ‘স্যাটা বোস’এর চরিত্রে উত্তম কুমারের অসাধারণ অভিনয় বহু দশক পরেও মনে রেখেছেন দর্শক।
‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি ১৯৬২ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার ৬০ বছর পরে ২০২২ সালেই ১২৫তম সংস্করণটি ছাপা হয়।
তার উপন্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই কলকাতার যে প্রকাশকের হাত দিয়ে বাজারে এসেছে, সেই ‘দেজ পাবলিশিং’ এর শুধাংশু শেখর দে বলছিলেন, “শুধু তো চৌরঙ্গী নয়, স্বর্গ মর্ত পাতালের সংস্করণ তো আরও বেশি। তার বইয়ের সংখ্যা তো একশো ছাড়িয়েছে, বেশিরভাগই আমাদের প্রকাশনা থেকেই ছাপা হয়েছে। লাখ লাখ কপি বিক্রি হয় এখনও।”
শুধু উপন্যাস নয়, স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তার লেখা নন-ফিকশানের বিক্রিও লাখ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই।
তার উপন্যাসের ওপরে ভিত্তি করে সিনেমা করেছেন সত্যজিৎ রায়। ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ ছবি দুটির মূল লেখক মনিশংকর মুখার্জীই।
সেই প্রসঙ্গে মি. মুখার্জী নিজে লিখেছিলেন যে, তার জন অরণ্য উপন্যাসটি পড়ে তার বাড়িতে ফোন করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেসময়ে তিনি বাড়িতে ছিলেন না।
পরে আবার যখন ফোন এল, ওপার থেকে সত্যজিৎ রায়ের গুরুগম্ভীর গলায় প্রশ্ন এসেছিল, “আমি কি মণিশংকর রায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারি?’
শংকর জবাব দিয়েছিলেন, “আমি মণিশংকর রায় না, মুখার্জী।”

১৯৫৫ সালে ‘কত অজানারে’ উপন্যাস দিয়ে তার সাহিত্য যাত্রা শুরু হয়েছিল – ফাইল ছবি
জনসংযোগ ছিল পেশা
অনেক সাহিত্যিকই কোনো না কোনো পত্রিকা দফতরে চাকরি করেন। কিন্তু মনিশংকর মুখার্জীর পেশা ছিল জনসংযোগ বা পাবলিক রিলেশনস, এখন যে পেশাকে বলা হয়ে থাকে কর্পোরেট কমিউনিকেশন।
একসময়ে ডানলপ কোম্পানিতে, পরে দীর্ঘ সময়ে আরপি গোয়েঙ্কা গোষ্ঠীর জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হিসাবে চাকরি করেছেন তিনি। আরপি গোয়েঙ্কা গোষ্ঠীর অধীনেই সিইএসসি সংস্থাটি – যারা কলকাতা আর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে।
তাদের সদর দফতর – মধ্য কলকাতার ‘ভিক্টোরিয়া হাউস’-এ ছিল তার দফতর।
সম্ভবত জনসংযোগ পেশাজীবী ছিলেন বলেই সাধারণ মানুষের কথা, সহজ সরল লেখনিতে তুলে ধরতে পারতেন মনিশংকর মুখার্জী।
সেকারণেই তার লেখার সঙ্গে নিজেদের ‘আইডেন্টিফাই’ করতে পারতেন বহু সাধারণ মানুষ, তার জনপ্রিয়তার চাবিকাঠিও ছিলে সেটা।
তবে যে লেখকের উপন্যাস লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়, বেশ কিছু উপন্যাসের একশরও বেশী সংস্করণ ছাপা হয়, তার প্রতি যে অন্য অনেক সাহিত্যিকেরই ঈর্শা থাকবে, সেটা স্বাভাবিক।
এটা সম্ভবত জানতেন তিনি নিজেও আর কিছুটা অভিমানও হয়ত তার ছিল। তবে তাতে তার লেখনিতে কোনো অদলবদল তো পাঠকরা দেখতে পায় নি।
‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটা যে বাক্য দিয়ে তিনি শেষ করেছিলেন, “আমি এগিয়ে চললাম”, সেভাবেই মনিশংকর মুখার্জী এগিয়ে গেছেন সাত দশকেরও বেশি সময় জুড়ে থাকা তার সাহিত্যজীবনে।
অবশেষে ২০২৬-এ এসে থমকে দাঁড়ালো তার কলম।
বিবিসি নিউজ বাংলা
Sarakhon Report 



















