ব্যস্ত আটলান্টার এক ফুটপাথে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি ছোট যন্ত্র। দেখতে যেন ছোট কুলারের মতো, চোখের মতো আলো টিমটিম করছে। কাছের সালাদ ও র্যাপের দোকানের কর্মীরা বলছেন, যেন তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই এই যন্ত্রগুলো রওনা দেয়—কখনো ছাত্রদের জন্য রাতের খাবার, কখনো অফিসপাড়ার কর্মীদের জন্য সুশি পৌঁছে দিতে। এগুলো আর সাধারণ কুরিয়ার নয়, পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় খাবার সরবরাহকারী রোবট।
দ্রুত বাড়ছে রোবটের দাপট
যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় এখন হাজার হাজার খাবার সরবরাহকারী রোবট ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গত বছরের শুরুতে যেখানে মাত্র একশটি রোবট চালু করেছিল, এখন তাদের সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছেছে এবং বিশটি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য কোম্পানিগুলোর কাছেও হাজার হাজার রোবট রয়েছে।
এই যন্ত্রগুলো চারপাশের পরিবেশ বুঝতে ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে—কখন রাস্তা পার হবে, কীভাবে দৌড়বিদ এড়িয়ে চলবে কিংবা তুষারের ঢিবি টপকাবে। বড় বড় খাবার সরবরাহ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তির ফলে এগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ দখল করছে—এর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি।

দক্ষতার প্রতিশ্রুতি
রোবট নির্মাতাদের দাবি, এতে খরচ কমবে এবং পরিবহন আরও যুক্তিসংগত হবে। তাদের মতে, দুই পাউন্ডের একটি খাবার দুই টনের গাড়িতে বহন করা অযৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক-চতুর্থাংশ গাড়ি চলাচলই শেষ ধাপের ছোটখাটো কেনাকাটার জন্য হয়, যা রাস্তায় জট বাড়ায় এবং খরচও বাড়ায়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি খাবার বহনকারী ছোট রোবট মোটরসাইকেলের তুলনায় প্রায় একশ গুণ বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী। সমর্থকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি স্থানীয় অর্থনীতিকেও চাঙা করতে পারে।
কিন্তু মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে
সমস্যা হলো, সাধারণ মানুষ এই রোবটগুলোকে খুব একটা পছন্দ করছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পথচারীদের রোবট ধাক্কা দেওয়া, উল্টে ফেলা বা আক্রমণের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কেউ খাবার বের করার চেষ্টা করছে, কোথাও আবার রাগ ঝাড়ছে যন্ত্রের ওপর। এক ভিডিওতে মিয়ামির এক ব্যক্তি রোবটটিকে সেতু থেকে ছুড়ে ফেলার চেষ্টা করেন।

ক্ষোভ এখন আন্দোলনেও রূপ নিচ্ছে। শিকাগোয় তিন হাজারের বেশি বাসিন্দা শহরে রোবট নিষিদ্ধের দাবিতে স্বাক্ষর করেছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পাদকীয় বোর্ডও শিক্ষার্থীদের এসব যন্ত্র বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে।
রোবটবিরোধী মনোভাব নতুন নয়
যুক্তরাষ্ট্রে রোবট নিয়ে অস্বস্তি আগেও দেখা গেছে। কয়েক বছর আগে এক ভ্রমণকারী মানবাকৃতি রোবট কানাডা ও ইউরোপে নিরাপদে ঘুরে বেড়ালেও আমেরিকায় ঢোকার দুই সপ্তাহের মধ্যে সেটিকে ভাঙচুর অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সান ফ্রান্সিসকোর একটি নিরাপত্তা রোবটকেও নোংরা করে দেওয়ার ঘটনা সামনে আসে।
এক জরিপে দেখা গেছে, ধনী দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনুপ্রবেশ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
ভাবমূর্তি বদলাতে নির্মাতাদের চেষ্টা

সমালোচনা কমাতে কিছু কোম্পানি তাদের রোবটকে নাম দিয়েছে এবং কুকুরছানার মতো চোখ বসিয়েছে, যাতে এগুলো আরও বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হয়। পথচারীদের কাছে ধীরগতিতে চলা বা ঘুরে দিক নির্দেশ করার মতো আচরণও শেখানো হচ্ছে।
নির্মাতাদের দাবি, অনলাইনে যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে তা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বড় করে দেখানো হচ্ছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সব রোবটই সফলভাবে ডেলিভারি সম্পন্ন করছে। ভবিষ্যতে ওষুধ আনা বা পণ্য ফেরত নেওয়ার মতো কাজেও এগুলো ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবু বাস্তবতা কঠিন—মানুষের ভিড়ভাট্টার দুনিয়ায় টিকে থাকাই এখন এসব খাবার ডেলিভারি রোবটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















