ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে কংগ্রেস সদস্য হওয়া এক সময় সম্মানজনক ও প্রভাবশালী পদ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন অনেক আইনপ্রণেতার কাছে এটি ক্রমেই ক্লান্তিকর, ঝুঁকিপূর্ণ এবং হতাশাজনক পেশায় পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের বহু সদস্য পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ায় এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডন বেকন নামে নেব্রাস্কার এক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি যেন ভেঙে পড়েছেন। প্রতি দুই বছর পরপর নির্বাচন, বিপুল অর্থ সংগ্রহ এবং প্রতিদিন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা—সব মিলিয়ে কাজটি অসহনীয় হয়ে উঠছে। তিনি একা নন; মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অন্তত ৬০ জন কংগ্রেস সদস্য সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, যা নির্বাচনী বছরের এত আগে একটি রেকর্ড।
কাজের চাপ ও বাস্তবতা
একজন আইনপ্রণেতার সাধারণ সপ্তাহ শুরু হয় গভীর রাতে ওয়াশিংটনে উড়ে এসে। প্রায়ই এমন বিলের ওপর ভোট দিতে হয়, যা পড়ার সময়ই মেলে না। দলীয় নেতৃত্বের চাপ থাকে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য। এর পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে ১৫ থেকে ২৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয় দাতাদের ফোন করে পুনর্নির্বাচনের তহবিল জোগাড়ে।

কমিটি বৈঠকগুলো প্রায় একই সময়ে পড়ে, ফলে সদস্যদের এক বৈঠক থেকে আরেক বৈঠকে ছুটতে হয়, অনেক সময় শুধু ভিডিও ক্লিপ তৈরির জন্য উপস্থিত হতে হয়। বৃহস্পতিবার ভোট শেষ করেই অনেককে নিজ রাজ্যে ফিরতে হয়, যেখানে অপেক্ষা করে ফিতা কাটা অনুষ্ঠান ও ভোটারদের অভিযোগ শোনা। এত পরিশ্রম সত্ত্বেও ফল খুব কম।
আইন পাসে স্থবিরতা
২০২৩ থেকে ২০২৫ পূর্ণ মেয়াদে কংগ্রেস মাত্র ২৭৪টি আইন পাস করেছে, যা গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর অনেকগুলোই ছিল তুচ্ছ প্রকৃতির। বড় ধরনের আইন প্রায়ই দলীয় অচলাবস্থায় আটকে যাচ্ছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ আমেরিকান কংগ্রেসের কাজের প্রতি সন্তুষ্ট।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে

কংগ্রেস সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গত বছরে তাদের ও তাদের পরিবারকে লক্ষ্য করে প্রায় ১৪ হাজার ৯৩৮টি হুমকির ঘটনা তদন্ত করেছে ক্যাপিটল পুলিশ, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি। ২০২২ সালে তৎকালীন স্পিকারের স্বামী হামলার শিকার হন। এর আগে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে হামলার ঘটনাও আইনপ্রণেতাদের ভীত করে রেখেছে।
বেতন বাড়েনি, বাস্তব আয় কমেছে
কংগ্রেস সদস্যদের বার্ষিক বেতন ১ লাখ ৭৪ হাজার ডলার গত ১৭ বছর ধরে অপরিবর্তিত। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে প্রকৃত আয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। ভাড়া বাঁচাতে অনেক সদস্য নিজেদের অফিসেই রাত কাটান।
দলীয় বিভাজন বড় কারণ

বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র দলীয় মেরুকরণ আইনপ্রণেতাদের স্বাধীনতা কমিয়ে দিয়েছে। গত ৮০ বছরের মধ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের আদর্শিক দূরত্ব এখন সবচেয়ে বেশি। দলীয় লাইনের বাইরে গেলে প্রাইমারিতে দল থেকেই বাদ পড়ার ঝুঁকি থাকে। ক্যালিফোর্নিয়ার এক কংগ্রেস সদস্য জুলিয়া ব্রাউনলি বলেছেন, পরিস্থিতি সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়।
ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, কমিটির গুরুত্ব কম
আগে কমিটিগুলো আইন প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ক্ষমতা ক্রমে হাউস স্পিকার ও সিনেট নেতাদের কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এখন বড় বাজেট বিলগুলো গোপনে আলোচনা করে একসঙ্গে পাস করানো হয়, যা অনেক সদস্যই পুরোপুরি পড়ে দেখার সুযোগ পান না। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না থাকলে এই পদে থাকার মানে কী।
জনসমক্ষে নাটকীয়তা বাড়ছে

শুনানিগুলোও অনেক সময় নীতিনির্ধারণের বদলে ব্যক্তিগত প্রচারের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার মতো মুহূর্ত তৈরি করাই অনেক উচ্চাভিলাষী সদস্যের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনবল সংকট ও লবিস্ট নির্ভরতা
সরকারের কাজ বেড়েছে, কিন্তু কংগ্রেসের সহায়ক কাঠামো সে তুলনায় বাড়েনি। আশির দশকের তুলনায় হাউস কমিটিতে এখন কর্মী কম। একজন সদস্যের অফিসে সাধারণত তিন থেকে চারজন তরুণ কর্মী নীতিগত কাজ সামলান। দক্ষরা দ্রুত বেসরকারি খাতে চলে যান বেশি আয়ের জন্য। ফলে অনেক সদস্য বাধ্য হয়ে লবিস্টদের ওপর নির্ভর করছেন।
ভবিষ্যৎ কি বদলাবে

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিষাক্ত পরিবেশ মধ্যপন্থী প্রার্থীদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখছে, আর কঠোর দলীয় রাজনীতিকদেরই টেনে আনছে। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন কংগ্রেসে কাজ করা অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন সংস্কারের চাপ বাড়ে—যেমনটি ঘটেছিল সত্তরের দশকে ওয়াটারগেটের পর।
কংগ্রেসকে কার্যকর করতে কমিটিকে শক্তিশালী করা, নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কার এবং সদস্য ও কর্মীদের বেতন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে এর জন্য দুই দলের ঐকমত্য দরকার, যা আপাতত খুব দূরের সম্ভাবনা বলেই মনে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















