বিশ্ব অর্থনীতি নতুন এক উদ্বেগের মোড়ে দাঁড়িয়ে। ২০২৫ সালের শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ পৌঁছেছে রেকর্ড ৩৪৮ ট্রিলিয়ন ডলারে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ যোগ হয়েছে, যা মহামারির পর সবচেয়ে দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির নজির হিসেবে ধরা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক খাতের এক শীর্ষ সংস্থার সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এই চিত্র।
সরকারি ব্যয়েই ঋণের বড় উল্লম্ফন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঋণ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বিভিন্ন দেশের সরকার। মোট বৃদ্ধির মধ্যে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে সরকারি খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় অঞ্চলের দেশগুলো মিলেই এই ঋণ বৃদ্ধির প্রায় তিন-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী।
এখন বৈশ্বিক ঋণচক্রে পরিবার বা বেসরকারি কোম্পানির চেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে সরকারের ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি। বছরের শুরুতেই বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড বাজারে ছাড়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বন্ড বাজার সহজেই গ্রহণ করেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই ধার কতদিন পর্যন্ত চাপ না বাড়িয়ে টিকে থাকতে পারবে।

ঋণ-জিডিপি অনুপাতের নতুন বার্তা
২০২৫ সালে মোট উৎপাদনের তুলনায় বৈশ্বিক ঋণের হার সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৮ শতাংশে। উন্নত অর্থনীতির কারণে এই অনুপাত কিছুটা কমেছে। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। সেখানে ঋণ-উৎপাদন অনুপাত বেড়ে রেকর্ড ২৩৫ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক সম্প্রসারণ, নমনীয় মুদ্রানীতি ও নিয়ন্ত্রক সহজীকরণ একসঙ্গে কাজ করলে ঋণ আরও বাড়তে পারে। এতে বাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকি ও উত্তাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি ও করপোরেট ঋণের বিস্তার
২০২৫ সালের শেষে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে অ-আর্থিক করপোরেট ঋণ পৌঁছেছে ১০০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। গৃহস্থালি ঋণ তুলনামূলক ধীরগতিতে বেড়ে হয়েছে ৬৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে মোট ঋণ বেড়ে হয়েছে ২৩১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। উদীয়মান অর্থনীতিতে এই অঙ্ক ১১৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে। মহামারির পর বেসরকারি খাতের ঋণ কিছুটা কমলেও সরকারি ঋণ ক্রমেই বাড়ছে, যা সুদের হার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরিবর্তনে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিনিয়োগে করপোরেট ধার
বছরের শুরুতে রেকর্ড পরিমাণ সরকারি বন্ড ইস্যু হয়েছে। একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয়ভাবে বাজার থেকে ঋণ নিয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও রূপান্তরমুখী প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করায় করপোরেট ধার বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজ আর্থিক পরিবেশ ও উচ্চ ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা উচ্চ ফলনশীল বন্ড, লিভারেজ ঋণ এবং শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও ঋণ বাড়াতে সহায়তা করেছে। ২০২৬ সালেও যদি বাজেট ঘাটতি বড় থাকে এবং কোম্পানিগুলো বন্ডের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ অব্যাহত রাখে, তবে বৈশ্বিক ঋণ আরও বাড়তে পারে।

বৃদ্ধির গতি কি যথেষ্ট
আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। উন্নত অর্থনীতিতে তা প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং উদীয়মান অর্থনীতিতে সামান্য বেশি ৪ শতাংশের ওপরে থাকতে পারে।
এই প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল হলেও দ্রুত ঋণের ভার কমানোর মতো শক্তিশালী নয়। ২০২৫ সালের মতো ধার অব্যাহত থাকলে ঋণ-জিডিপি অনুপাত আবারও বাড়তে পারে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিতে যেখানে ঋণের চাপ ইতিমধ্যেই রেকর্ড পর্যায়ে।
২০২৬ সালে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করতে হবে, যা নতুন রেকর্ড। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রেও ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ বন্ড ও ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হবে। আপাতত বাজারে চাহিদা শক্তিশালী থাকলেও সরকারি ধার, বিপুল পুনঃঅর্থায়ন এবং বছরের শুরুতেই বড় ইস্যু—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক ঋণ ঐতিহাসিক উচ্চতায় দীর্ঘদিন স্থির থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















