বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ার নিয়ে আশাবাদ তুঙ্গে। নীতিনির্ধারক থেকে অর্থনীতিবিদ—অনেকেই মনে করছেন, উৎপাদনশীলতার বড় ধরনের উল্লম্ফন হলে তা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে নতুন গতি আনতে পারে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—ঋণে জর্জরিত উন্নত দেশগুলোর আর্থিক সংকট কি এতে সত্যিই কাটবে?
ঋণের চাপ কোথায় দাঁড়িয়ে
বর্তমানে অধিকাংশ ধনী দেশের সরকারি ঋণ তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের শতভাগ ছাড়িয়ে গেছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য, সুদের বাড়তি বোঝা, প্রতিরক্ষা ও জলবায়ু খাতে বাড়তি ব্যয়—সব মিলিয়ে আগামী দশকে ঋণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০৩৬ সালের মধ্যে ওইসব দেশে গড় ঋণের হার উৎপাদনের প্রায় দেড়গুণে পৌঁছাতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে সরকারের রাজস্বও বাড়তে পারে, ফলে ঋণের চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সহজ হতে পারে।

উৎপাদনশীলতা কতটা বদল আনতে পারে
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতায় স্থায়ী উন্নতি আসে, তাহলে আগামী দশকে উন্নত দেশগুলোর ঋণের হার প্রায় দশ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কম হতে পারে। তবে সেটিও বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, আশাবাদী পরিস্থিতিতে আগামী দশকে ঋণের হার ধীরে বাড়তে পারে এবং প্রায় একশ কুড়ি শতাংশে স্থির হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি প্রত্যাশা পূরণ না করলে, প্রবৃদ্ধি কমে গেলে এবং বাজারে সুদের চাপ বাড়লে ঋণের হার আরও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় বাধা জনসংখ্যাগত পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যা উৎপাদনশীলতার ঘাটতি নয়, বরং দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোনো জনসংখ্যা। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য পেনশন ও স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় মোট সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ দখল করে আছে। উৎপাদনশীলতা বাড়লেও এসব ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না।
আরও একটি বড় প্রশ্ন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থান বাড়াবে, নাকি কমাবে? যদি স্বয়ংক্রিয়তার কারণে চাকরি কমে যায় এবং মুনাফা মূলত পুঁজি মালিকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে কর আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়বে না। অন্যদিকে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে যদি মজুরি বাড়ে, তাহলে রাজস্বও বাড়তে পারে, তবে সরকারি ব্যয়ও একই সঙ্গে বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।

সুদের হার ও বাজারের চাপ
ঋণের বোঝা কেবল প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না, সুদের হারও বড় ভূমিকা রাখে। যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে প্রকৃত সুদের হার বেড়ে যায়, তাহলে ঋণ পরিষেবার খরচও বাড়বে। আবার মন্দা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন, যা সরকারের ঋণগ্রহণ ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনিশ্চয়তার ছায়া
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিছুটা সময় কিনে দিতে পারে, কিন্তু একে জাদুর কাঠি ভাবার সুযোগ নেই। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য ব্যয়সংযম, করব্যবস্থার সংস্কার এবং জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা—সব মিলিয়ে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।
সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক, ঋণে জর্জরিত উন্নত অর্থনীতির জন্য এটি একমাত্র উদ্ধারপথ নয়। বরং এটি হতে পারে সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















