অনেক সময় আমরা ভাবি শিশু খাবারে বাছবিচার করছে, একটু জোর করলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়। এআরএফআইডি নামে পরিচিত একটি খাওয়া-সংক্রান্ত মানসিক সমস্যা এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত। এটি একগুঁয়েমি, আদিখ্যেতা বা সাময়িক সমস্যা নয়; সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে সুস্থ হওয়া সম্ভব।
খাবার টেবিলের আতঙ্ক থেকে ওজন কমে যাওয়া
তেরো বছরের এক কিশোরীর গল্প বিষয়টি বোঝাতে সাহায্য করে। জ্বর ও প্রচণ্ড বমির পর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাকে। সেই অভিজ্ঞতার পর থেকেই বমির ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। ধীরে ধীরে সে নানা খাবার এড়াতে শুরু করে। একসময় তার খাদ্যতালিকা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় শুধু বিস্কুট ও দুধে।
নতুন খাবার খেতে বললেই কান্না, অস্থিরতা, টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া—পরিবারে শুরু হয় অশান্তি। আত্মীয়স্বজন বলেন, কঠোর হলেই ঠিক হবে। বাবা-মা নিজেদের দোষী ভাবতে থাকেন। কিন্তু মেয়েটির ওজন কমতে থাকে, ক্লান্তি বাড়ে, পড়াশোনায় মন বসে না, বন্ধুদের অনুষ্ঠানে যাওয়াও এড়িয়ে যায়। পরে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে ধরা পড়ে এআরএফআইডি।

এআরএফআইডি কী
ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক পরিবারেই শিশুদের খাবারে বাছবিচারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাধারণত বলা হয়, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এআরএফআইডি একটি স্বীকৃত খাওয়া-সংক্রান্ত মানসিক ব্যাধি, যা অবহেলা করলে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এতে উল্লেখযোগ্য ওজন হ্রাস, শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, স্কুল বা কাজের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। পারিবারিক অনুষ্ঠান, বাইরে খাওয়া কিংবা স্কুলের মধ্যাহ্নভোজ—সবই হয়ে ওঠে চাপের।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সীমিত খাওয়া ধর্মীয় উপবাস, দারিদ্র্যজনিত খাদ্যাভাব, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা শরীরের গঠন নিয়ে ভয় বা ওজন বাড়ার আতঙ্ক থেকে আসে না।

কেন হয় এই সমস্যা
এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের নির্দিষ্ট গঠন বা স্বাদে তীব্র বিরাগ, খাবার খেলে ক্ষতি হবে এমন ভয়, পারিবারিক ইতিহাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বা কোনো আঘাতজনিত অভিজ্ঞতা—যেমন খাবার গলায় আটকে যাওয়া, জোর করে খাওয়ানো কিংবা অসুস্থতার পর বমির অভিজ্ঞতা—এসব থেকে সমস্যা শুরু হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণভাবে বলা দরকার, এটি খারাপ অভিভাবকত্বের ফল নয়।

চিকিৎসা ও আশার কথা
সুখবর হলো, যথাযথ পেশাগত সহায়তা পেলে এআরএফআইডি থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব। ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকা বাড়ানো, পুষ্টি উন্নত করা এবং ভয় কমানোই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য। এজন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন।
মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা, বিশেষ করে জ্ঞানভিত্তিক আচরণগত পদ্ধতি, রোগীকে ধীরে ও নিরাপদভাবে নতুন খাবার চেষ্টা করতে সাহায্য করে। উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও শিথিলায়ন অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জোর করে খাওয়ানো বা শাস্তি দেওয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। বরং শান্ত ও সহায়ক পরিবেশ, চাপমুক্ত নিয়মিত খাবারের সময় এবং সামান্য অগ্রগতিতেও উৎসাহ—এসবই সুস্থতার পথে বড় পদক্ষেপ।
যে কিশোরীর কথা বলা হয়েছে, চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তায় ধীরে ধীরে তার ওজন বাড়ে, নতুন খাবার গ্রহণ শুরু করে এবং বমির ভয় কাটিয়ে ওঠে। আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে, পড়াশোনায় উন্নতি হয়।
বাস্তবতা স্বীকার জরুরি
এআরএফআইডি একটি বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি একগুঁয়েমি নয়, মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা নয়, সাময়িক খামখেয়ালিও নয়। সময়মতো সঠিক সহায়তা পেলে একজন মানুষ সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপন করতে পারে এবং খাবারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















