বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, আর্থিক চাপ ও নীতিগত অস্বচ্ছতার ঝুঁকিতে—এমন আশঙ্কা তুলে নতুন করে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। সংস্থাটি বলছে, চাহিদার অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় আর্থিক বোঝা তৈরি করতে পারে।
চাহিদা পূর্বাভাস নিয়ে প্রশ্ন
সংস্থাটির গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে—এমন পূর্বাভাস সরকারি পরিকল্পনায় থাকলেও স্বাধীন বিশ্লেষণে প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৩০ গিগাওয়াট হতে পারে। শিল্পখাতের বাস্তব ব্যবহার তথ্যের বদলে সামষ্টিক দেশজ উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদাকে জুড়ে দেখানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। একবার এই সক্ষমতা তৈরি হলে তা থেকে সরে আসা কঠিন হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে ভর্তুকি ও সক্ষমতা ভাতার চাপ বাড়বে।

সক্ষমতা ভাতা ও আর্থিক চাপ
গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও তাদের সক্ষমতা ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ২০২৪ সালে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়লেও আর্থিক চাপ কমেনি। বিদ্যুৎকেন্দ্রভিত্তিক পরিশোধের বিস্তারিত তথ্য ও মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা যথেষ্ট স্বচ্ছ নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ‘বিদ্যুৎ না দিলে অর্থ নয়’ শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি, যাতে নিঃশর্ত সক্ষমতা ভাতা পরিহার করা যায়। পাশাপাশি কঠোর ‘নাও বা দাও’ ধরনের চুক্তি পুনর্বিবেচনার কথাও বলা হয়েছে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও ঝুঁকি
প্রতিবেদনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ভবিষ্যতে অচল সম্পদে পরিণত হতে পারে। নতুন কয়লাভিত্তিক প্রকল্প, বিশেষ করে মাতারবাড়ীর দ্বিতীয় ধাপ, সংসদীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমাবদ্ধতা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা অনুমোদিত হলেও গ্রিডে পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রহণের সক্ষমতা এখনো প্রায় ২০ শতাংশে সীমিত। ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রহণের উপযোগী করতে গ্রিডে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি গ্রিড ব্যবস্থাপনাকে নিরপেক্ষ করতে একটি স্বতন্ত্র সিস্টেম পরিচালনা কাঠামো গড়ার কথাও বলা হয়েছে।

গ্যাস সংকট ও বিকল্প পথ
প্রাথমিক জ্বালানি খাতে দৈনিক প্রায় ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মোট চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের সামান্য বেশি। কেবল আমদানি বাড়িয়ে এই ঘাটতি মেটালে আর্থিক চাপ বাড়বে, তাই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংসদীয় তদারকি জোরদারের আহ্বান
গবেষণায় নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প, জ্বালানি মিশ্রণ ও ক্রয় সিদ্ধান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ সংক্রান্ত বিশেষ বিধান আইনের স্থগিতাদেশকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যেই জীবাশ্মভিত্তিক নতুন প্রকল্প অনুমোদন বন্ধ, সংশোধিত চাহিদা পূর্বাভাসের স্বাধীন যাচাই এবং প্রধান খাতভিত্তিক সিদ্ধান্তে সংসদীয় নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে গ্রিড আধুনিকায়ন, জবাবদিহিতা কাঠামো শক্তিশালী করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, স্বচ্ছতা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিদ্যুৎ খাত আবারও অতিরিক্ত সক্ষমতা ও আর্থিক চাপে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















