বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতে স্থবিরতা কাটাতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উদ্যোক্তাদের আস্থা সংকট। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দার পর নতুন সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থিতিশীলতা ও স্পষ্ট নীতিনির্দেশ ছাড়া প্রকৃত ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সময়ের ধাক্কা, এখনো কাটেনি মন্দা
দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনামলে দেশের ব্যবসা খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন শেষে কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতি ফিরলেও শিল্প ও বিনিয়োগে এখনো দৃশ্যমান গতি আসেনি। উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, আস্থা ফেরানোই এখন প্রধান কাজ। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনার ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন। সেই আস্থা পুনর্গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে।

চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি থামানোই অগ্রাধিকার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেছেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক করতে সবার আগে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। তার ভাষায়, কারখানায় পণ্যবাহী গাড়ি ঢোকা-যাওয়ার সময়ও চাঁদা দিতে হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পরও এ চিত্র খুব বেশি বদলায়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি ও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের বড় বাধা হয়ে আছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পাবেন না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলও একই উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কেউ এখন আত্মবিশ্বাসী নন। মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতি ও ফাইল জট কমাতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
তৈরি পোশাক খাতে চাপ, রপ্তানিতে পতন
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও কঠিন সময় পার করছে। অন্তর্বর্তী সময়ের মধ্যে চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈশ্বিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও শুল্কযুদ্ধের প্রভাবে রপ্তানি আয় কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় দুই দশমিক চার তিন শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে এলসি খোলার হারও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। মজুরি, জ্বালানি বিল, পরিবহন ব্যয় ও ব্যাংক সুদের চাপ শিল্পকে আরও চাপে ফেলেছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতাও ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

নীতিগত সংস্কার ছাড়া পথ কঠিন
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। সরকারকে একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হচ্ছে।
নীতি গবেষণা সংস্থার অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগের ভঙ্গুর অবস্থা এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এখন বড় বাধা। তারা বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রানীতিতে সতর্কতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী মহলের অভিমত, সুশাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছ নীতির মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। আইনশৃঙ্খলা ও আস্থা—এই দুই স্তম্ভ শক্ত না হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















