মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন যখন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির এক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখন ‘স্বাধীন এবং কিছুটা বিচ্ছিন্ন’ অবস্থায় কাজ করছে। একই সঙ্গে ওমানের দুকম বন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনাকে তিনি ‘আমাদের পছন্দের সিদ্ধান্ত ছিল না’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটোই বাড়ছে।

দুকম বন্দরে ড্রোন আঘাত, আহত বিদেশি কর্মী
রবিবার ওমানের দুকম বন্দরে ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। একটি ড্রোন সরাসরি বিদেশি শ্রমিকদের আবাসিক এলাকায় পড়ে। এতে অন্তত একজন আহত হন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আরেকটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ বন্দরের জ্বালানি ট্যাংকের কাছাকাছি পড়ে। সৌভাগ্যবশত এতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি।
ঘটনার পরপরই ওমান সরকার তীব্র নিন্দা জানায়। আরব লীগও এই হামলাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে মন্তব্য করে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন হামলা বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ইরানের অবস্থান ও কূটনৈতিক যোগাযোগ
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সামরিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ওমানের ঘটনাটি ইরানের পছন্দের পদক্ষেপ ছিল না। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে ওমান ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে তার সরাসরি আলোচনা হয়েছে। উত্তেজনা যাতে আরও না বাড়ে, সে জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত আছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
এই মন্তব্য অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামরিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ে টানাপোড়েন থাকতে পারে, অথবা চলমান যুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনে পরিবর্তন এসেছে।

ওমানের আহ্বান: যুদ্ধের মাঝেও শান্তির আশা
রবিবার ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দেন। তিনি বলেন, কূটনীতির দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তবু শান্তির আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তার ভাষায়, যত দ্রুত আলোচনায় ফেরা যাবে, ততই সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে। ওমান দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই বর্তমান সংকটে দেশটির অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
![]()
ওমান উপসাগরে মার্কিন হামলা, জাহাজ ডুবির দাবি
এদিকে ওমান উপসাগরে ইরানি জাহাজ লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানায়, অন্তত একটি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত নয়টি জাহাজ ডুবে গেছে।
এই সামরিক পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। উপসাগরীয় জলপথ বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।

অনিশ্চয়তার ছায়ায় মধ্যপ্রাচ্য
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন অতি সংবেদনশীল এক সময়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া, পাশাপাশি ওমানের কূটনৈতিক আহ্বান—এই তিনটি দিক একসঙ্গে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধের ভাষা যত জোরালো হচ্ছে, ততই কূটনীতির গুরুত্ব বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনা টেবিলে ফেরার সুযোগ কতটা তৈরি হয়, নাকি সংঘাত আরও বিস্তৃত রূপ নেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















