চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহরে প্রথমবারের মতো টাইপ ০৫৫ শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার যুক্ত হতে যাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ তাইওয়ান প্রণালী ও প্রথম দ্বীপমালা অতিক্রম করে চীনের নৌতৎপরতা আরও জোরদার করার ইঙ্গিত বহন করছে।
ঝৌশানে দেখা মিলল নতুন যুদ্ধজাহাজ
জানুয়ারির শেষ দিকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, পূর্ব চীন সাগর উপকূলের ঝৌশান নৌঘাঁটিতে দুটি টাইপ ০৫৫ গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার নোঙর করে আছে। জাহাজ দুটির গায়ে ১০৯ ও ১১০ নম্বর হাল নম্বরও দেখা গেছে, যা শিগগিরই সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
১২ হাজার টনের বেশি ওজনের এই বিশাল যুদ্ধজাহাজগুলোর দ্বিতীয় ব্যাচ এখন ধীরে ধীরে সক্রিয় পরিষেবায় প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক ছবিতে থাকা দুটি জাহাজের নাম ডংগুয়ান ও আনচিং বলে জানা গেছে। এগুলোই পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহরে যুক্ত হওয়া প্রথম টাইপ ০৫৫।
পূর্বাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের অধীনে থাকা এই নৌবহর তাইওয়ানমুখী জলসীমা এবং জাপানের দিকে বিস্তৃত পূর্ব চীন সাগর অঞ্চলের কার্যক্রম তদারকি করে।

জাপান-চীন উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
এই মোতায়েনের সময়টি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত বছর তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্য করে বলেছিলেন, তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে টোকিও সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। চীন এই মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
বেইজিং তাইওয়ানকে নিজের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুনরেকত্রীকরণের অবস্থান ধরে রেখেছে। অধিকাংশ দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও, যুক্তরাষ্ট্র বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে এবং তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় দ্বীপমালার কৌশল
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো কলিন কোহের মতে, সম্ভাব্য তাইওয়ান প্রণালী সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরোধে চীন প্রথম ও দ্বিতীয় দ্বীপমালার মাঝামাঝি এলাকায় পাল্টা হস্তক্ষেপ কৌশল জোরদার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলে প্রথম দ্বীপমালা বলতে জাপান দ্বীপপুঞ্জ থেকে তাইওয়ান ও ফিলিপাইন হয়ে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে বোঝায়। দ্বিতীয় দ্বীপমালা জাপান থেকে পালাউ ও গুয়াম পর্যন্ত আরও পূর্বদিকে বিস্তৃত।

কোহের মতে, শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডারে সজ্জিত টাইপ ০৫৫ এসব অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই জাহাজের সংখ্যা বাড়লে প্রথম দ্বীপমালার বাইরে দূর সমুদ্রে যুদ্ধাভ্যাসও বাড়বে, যা বিদেশি সামরিক বাহিনীর নজরদারি আরও তীব্র করবে।
টাইপ ০৫৫: চীনের সমুদ্রশক্তির কেন্দ্রবিন্দু
ন্যাটো যাকে রেনহাই শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেই টাইপ ০৫৫ আকারে প্রায় ক্রুজারের সমান। এতে রয়েছে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সাবমেরিন-বিরোধী সক্ষমতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠে যুদ্ধের উন্নত প্রযুক্তি।
১১২ সেলবিশিষ্ট উল্লম্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও আধুনিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি এই জাহাজ মূলত বিমানবাহী রণতরী ও টাইপ ০৭৫ ও টাইপ ০৭৬ শ্রেণির বৃহৎ উভচর আক্রমণ জাহাজকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নকশা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ব্যাচে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন
২০২৩ সাল থেকে ছয়টি নতুন টাইপ ০৫৫ জাহাজ পানিতে নামানো হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নির্মিত প্রথম আটটি জাহাজের তুলনায় দ্বিতীয় ব্যাচে কিছু উন্নতি আনা হয়েছে।
নতুন সংস্করণে সামনের ব্রিজ পুনরায় নকশা করা হয়েছে, যেখানে জানালার সংখ্যা কম হলেও আকার বড়, ফলে কমান্ডারদের দৃষ্টিসীমা বাড়ে। কিছু বিশ্লেষক ধারণা করছেন, ভবিষ্যতে উচ্চশক্তির অস্ত্র ব্যবহারের জন্য সমন্বিত বৈদ্যুতিক প্রপালশন ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।

গত বছর সমুদ্র পরীক্ষার ছবিতে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেলগান বা লেজার অস্ত্র স্থাপনের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ মেলেনি।
পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহরের অগ্রাধিকার
প্রথম আটটি টাইপ ০৫৫ জাহাজ কেবল উত্তর ও দক্ষিণ নৌবহরে দেওয়া হয়েছিল। পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহর এতদিন এই শ্রেণির কোনো জাহাজ পায়নি।
চীনের সাবেক পিএলএ প্রশিক্ষক সং ঝোংপিংয়ের মতে, তাইওয়ান প্রণালী মাত্র ২০০ কিলোমিটার প্রশস্ত হওয়ায় স্থলভিত্তিক অস্ত্র দিয়েই কার্যকর অভিযান চালানো সম্ভব। সে কারণে শুরুতে অন্য নৌবহরগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
তবে এখন টাইপ ০৫৫ নির্মাণ ও অন্তর্ভুক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি নৌবহরই এ শ্রেণির শক্তিশালী সক্ষমতা থেকে উপকৃত হবে বলে তিনি মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে পূর্বাঞ্চলীয় নৌবহরে টাইপ ০৫৫ যুক্ত হওয়া তাইওয়ান ঘিরে সামরিক ভারসাম্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















