প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে “চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ” পর্যন্ত হামলা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই আক্রমণের তীব্রতা ধরে রাখা “কঠিন হবে না”, যদিও তিনি আরও মার্কিন হতাহতের আশঙ্কার কথাও স্বীকার করেছেন।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানে ক্ষমতা কীভাবে নতুন সরকারের হাতে যাবে—বা আদৌ বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো বহাল থাকবে কিনা—তা নিয়ে তার বক্তব্যে একাধিক ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী ধারণা উঠে আসে।
যুদ্ধের সময়কাল ও সামরিক প্রস্তুতি
ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে পেন্টাগনের কাছে পর্যাপ্ত সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা মজুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কতদিন এ ধরনের আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারবে—এ প্রশ্নে তিনি জবাব দেন, “আমাদের পরিকল্পনা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ।”
তিনি আরও বলেন, “এটা কঠিন হবে না। আমাদের বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের মজুত রয়েছে।”

তবে তিনি পেন্টাগনের সেই উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেননি, যেখানে বলা হয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভ অস্ত্রভাণ্ডার কমিয়ে দিতে পারে—যা তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত বা ইউরোপে রুশ আগ্রাসনের মতো পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে ‘তিনটি ভালো বিকল্প’
প্রায় ছয় মিনিটের কথোপকথনে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্বের জন্য তার কাছে “তিনটি খুব ভালো বিকল্প” আছে। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি।
এদিকে ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী কমিটি দেশ পরিচালনা করবে। লারিজানি পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার তত্ত্বাবধান করেছিলেন। জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার জন্য তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
লারিজানি ইরানের নেতৃত্ব দিতে পারেন কিনা—এ প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
খামেনির মৃত্যুর পর ক্ষমতার রূপরেখা
শনিবার বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় দেশ শাসন করেন তিনি।

ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করেন ইরানের এলিট সামরিক বাহিনী—বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা—অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেবে।
তার ভাষায়, “ভাবলে দেখবেন, তারা আসলে জনগণের কাছেই আত্মসমর্পণ করবে।”
উল্লেখ্য, জানুয়ারির বিক্ষোভে একই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালিয়ে হাজারো মানুষ হত্যা করেছিল।
ভেনেজুয়েলা মডেল বনাম গণঅভ্যুত্থান
এরপর ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মডেলের কথা বলেন। তিনি ভেনেজুয়েলায় তার নেওয়া পদক্ষেপের উদাহরণ টেনে বলেন, “ভেনেজুয়েলায় আমরা যা করেছি, সেটাই নিখুঁত পরিস্থিতি।”
তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভেনেজুয়েলায় যেমন কেবল শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে বাকি প্রশাসনকে রেখে দেওয়া হয়েছিল, তেমনি একটি কাঠামো ইরানেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে তার উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় পার্থক্যের কারণে ভেনেজুয়েলার কৌশল তেহরানে কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব।

ট্রাম্প বলেন, “সেখানে দুইজন ছাড়া সবার চাকরি ছিল বহাল।”
কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন, ইরানের জনগণ নিজেরাই সরকার উৎখাত করতে পারে। “ওরা বহু বছর ধরে এ নিয়ে কথা বলছে। এখন তাদের সুযোগ আসবে,” বলেন তিনি। এই বক্তব্য ভেনেজুয়েলা মডেলের ঠিক বিপরীত।
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
ট্রাম্পের মতে, পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে পারে। যদিও তেহরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ওই দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে।
সংঘাত শুরুর প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো থেকে তিনি কথা বলেন। এ সময় তিনি মার্কিন হতাহতের খবর পান। তিনি স্বীকার করেন, পেন্টাগনের পূর্বাভাস অনুযায়ী হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।
“তিনজনও আমার কাছে অনেক বেশি,” বলেন ট্রাম্প। “প্রক্ষেপণ অনুযায়ী সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।”

তবে শেষ পর্যন্ত ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপে নতি স্বীকার করবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, “দেশটি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।”
সামরিক অগ্রগতি ও নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গ
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে নয়টি জাহাজ ও নৌ সদর দপ্তর রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন নেতৃত্ব যদি বাস্তববাদী অংশীদার হিসেবে এগিয়ে আসে, তাহলে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে ইরানের জনগণ যদি সরকার উৎখাতে উদ্যোগী হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বা আদৌ তাদের রক্ষা করবে কিনা—সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। তার ভাষায়, “এখনই কোনো অঙ্গীকার করছি না; এখনও সময় আছে। আমাদের কাজ বাকি, তবে আমরা খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছি।”
প্রায় ছয় মিনিট পর ট্রাম্প সাক্ষাৎকার শেষ করেন। পরে রবিবার বিকেলে তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে যান
জোলান ক্যানো-ইয়াংস, ডেভিড ই. স্যাঙ্গার ও টাইলার পেজার 



















