মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পর জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তেলের দাম কতদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কী করে এবং ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
চলতি বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগেই প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছিল। রোববার বাজার খোলার পর দাম এক পর্যায়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে কিছুটা কমে প্রায় ৭৯ ডলারে স্থির হয়, যা জানুয়ারি ২০২৫ সালের পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর ফলে শুধু পেট্রোল পাম্পে নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এমন সময়ে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যখন বহু মানুষ আগেই অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ
ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। কিন্তু রোববার সেখানে জ্বালানি বহনকারী ট্যাংকারের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার যেখানে ৬৫টি ট্যাংকার এই পথ ব্যবহার করেছিল, রোববার বিকেল পর্যন্ত সেখানে মাত্র ৬টি ট্যাংকার চলাচল করেছে।
ওমান উপকূলের কাছে নোঙর করা একটি তেলবাহী জাহাজে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। একই এলাকায় আরেকটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে।
সৌদি আরব ও কাতারে প্রভাব
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একটি তেল শোধনাগারে দুটি ড্রোন হামলার চেষ্টা ব্যর্থ করা হলেও ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছোট আকারের আগুন লাগে। প্রতিদিন অর্ধ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন এই স্থাপনাটি ২০১৯ সালের বড় হামলার তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারকদের অন্যতম কাতারের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের দুটি স্থাপনায় সামরিক হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
দামের গতিপ্রকৃতি কী হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো বড় তেল স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না। যদি বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতি না হয়, তাহলে তেলের দাম কিছুদিন পর আবার কমে আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক হলেও বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কা থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এসব পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে বেচাকেনা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপের সময় তেলের দাম তেমন বাড়েনি, কারণ দেশটি বৈশ্বিক সরবরাহের খুবই সামান্য অংশ জোগান দেয়। কিন্তু ইরান নিজে বড় উৎপাদক, পাশাপাশি পারস্য উপসাগর অঞ্চলের অন্যান্য দেশও বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন করে। ফলে এখানকার অস্থিরতা বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
অতিরিক্ত সরবরাহ কি দামের উত্থান ঠেকাবে
সংঘাতের আগে বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত তেল উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এই অতিরিক্ত সরবরাহ সাময়িকভাবে দাম বাড়ার গতি কমাতে পারে। তেল উৎপাদক জোট ওপেক প্লাস ইতিমধ্যে এপ্রিল মাসে উৎপাদন সামান্য বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
গ্যাসোলিনের দামে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম কয়েক দিনের মধ্যে বাড়তে পারে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে বড় লাফ দেবে না। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে খুচরা পর্যায়ে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে ২০ থেকে ৩০ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও গ্যাসোলিনের দাম কিছুটা সময় নিয়ে বেড়েছিল। পরবর্তীতে কয়েক মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে ৫ ডলারের বেশি ছুঁয়েছিল।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা
ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ফিউচার মূল্য সোমবার প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এক মাসের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বন্ধ থাকে, তাহলে গ্যাসের দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে। এতে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সামরিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
অতীতে এমন পরিস্থিতিতে নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে চলাচল নিশ্চিত করেছে। তবে পারস্য উপসাগরে এ ধরনের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
সব মিলিয়ে, পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তেলের স্থাপনা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়—তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















