ঢাকার রামপুরায় জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও আহতের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে। নতুন ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের জন্য সময় চাওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনকে চার সপ্তাহ সময় দিয়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ শুনানির সময় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত প্রমাণ প্রস্তুতের জন্য সময় চাওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম মোর্তূজা মজুমদার সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
নতুন ডিজিটাল প্রমাণ সামনে আনতে চায় প্রসিকিউশন
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে আইনজীবী শেখ মাহদি উপস্থিত ছিলেন। আরেক প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম আদালতকে জানান, সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ সামনে এসেছে এবং সেটি আদালতে উপস্থাপন করতে চান তারা।

শুনানির সময় আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। ট্রাইব্যুনাল এখনো নতুন করে রায় ঘোষণার তারিখ বা পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেনি।
শক্ত প্রমাণ হিসেবে ভিডিওর উল্লেখ
শুনানি শেষে প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ধারা ৯(৪) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার বিধান অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য বাদ পড়ে গেলে মামলার যেকোনো পর্যায়ে অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়।
তিনি জানান, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি একে একে বিভিন্ন মামলা পর্যালোচনা শুরু করেন। যে মামলাগুলোর তদন্ত শক্তিশালী মনে হয়েছে সেগুলো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, আর যেগুলোতে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো নতুন নির্দেশনা দিয়ে তদন্ত সংস্থায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
রামপুরার এই মামলাটি তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই রায়ের পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
পর্যালোচনার সময় একটি ভিডিও পাওয়া যায় যেখানে আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে কথিতভাবে ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে দেখা যায়।

প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, ভিডিওতে তিনি কোথা থেকে গুলি করেছেন এবং কার নির্দেশে করেছেন তা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অজান্তেই এটি আগে আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
তিনি বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা প্রয়োজন বলেই প্রসিকিউশন অতিরিক্ত প্রমাণ হিসেবে ভিডিওটি জমা দেওয়ার অনুমতি চেয়েছে।
পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
এই মামলায় ঢাকার তৎকালীন মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে দুইজন নিহত ও একজন গুরুতর আহত হন।
বর্তমানে পাঁচ আসামির মধ্যে কেবল রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। অন্য আসামিরা এখনও পলাতক।
পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক কর্মকর্তা মশিউর রহমান এবং সাবেক উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি মামলার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। তখন আসামিপক্ষের আইনজীবী চঞ্চলের খালাস দাবি করেন, আর প্রসিকিউশন পাঁচজনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে।

প্রথমে ১৫ ফেব্রুয়ারি রায়ের তারিখ নির্ধারণের কথা থাকলেও পরে ৪ মার্চ রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে নতুন প্রমাণ উপস্থাপনের আবেদন গ্রহণ করায় বুধবার রায় ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আন্দোলনের সময় রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে নির্মাণাধীন একটি ভবনে আশ্রয় নিতে যান আমির হোসেন নামে এক ব্যক্তি।
পুলিশ তাকে ধাওয়া করে এবং ভবনের ছাদের রড ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় এক পুলিশ সদস্য তার দিকে ছয় রাউন্ড গুলি চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
একই দিনে বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে দুজন নিহত হন।
পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার পর গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















