শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশু প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমাচ্ছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক অভিভাবকই জানেন না তাদের সন্তানের আসলে কতটা ঘুম প্রয়োজন। ফলে তৈরি হচ্ছে ঘুমের ঘাটতি, যার প্রভাব পড়তে পারে শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে।
শিশুদের কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সভেদে শিশুদের ঘুমের প্রয়োজন ভিন্ন। নবজাতকের জন্য দৈনিক প্রায় ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। শিশু বয়সে এই সময় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা। টডলার বা ছোট শিশুদের দরকার ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা, প্রাক-প্রাথমিক বয়সে ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা এবং স্কুলগামী শিশুদের প্রয়োজন অন্তত ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুম।
কিন্তু জরিপ বলছে, প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু নিয়মিতভাবে এই সুপারিশকৃত ঘুম পাচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি আরও বেশি।

পরিবারের ওপরও পড়ছে প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ অভিভাবকই মনে করেন ভালো ঘুম পুরো পরিবারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য জরুরি। একই সঙ্গে প্রায় ৮০ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন, সন্তান ঠিকমতো না ঘুমালে তাদের নিজেদের ঘুমও ব্যাহত হয়।
অভিভাবকদের মতে, শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এবং দিনের কাজকর্মেও প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে ভালো ঘুম শিশুর আচরণ, মনোযোগ ও দৈনন্দিন পারফরম্যান্স উন্নত করে।
অনেক অভিভাবকই জানেন না ঘুমের প্রকৃত প্রয়োজন
জরিপে আরও দেখা গেছে, অধিকাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানের ঘুম নিয়ে প্রতিদিন ভাবেন। অনেকেই দিনে গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন। এমনকি অনেক অভিভাবক বলেছেন, সন্তানের ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে তারা অর্থ ব্যয় করতেও প্রস্তুত।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনেক অভিভাবকই শিশুদের প্রকৃত ঘুমের প্রয়োজনকে কম করে অনুমান করেন। বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে এই ভুল ধারণা বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের প্রয়োজনীয় সময়ের তুলনায় এক ঘণ্টারও বেশি কম ঘুম হচ্ছে।

শিশুদের সঙ্গে ঘুম নিয়ে আলোচনা কম
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক পরিবারে ঘুমের গুরুত্ব নিয়ে শিশুদের সঙ্গে তেমন আলোচনা হয় না। প্রায় অর্ধেক অভিভাবকই বলেছেন, তারা খুব কম বা কখনওই এ বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি জটিলভাবে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। সহজভাবে বলা যেতে পারে যে ঘুম শরীরকে বড় হতে সাহায্য করে, মস্তিষ্ককে শেখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং মন ভালো রাখতে সহায়তা করে।
দুপুরের ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দিনের ঘুম বা দুপুরের ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক বছরের কম বয়সী প্রায় ৯৩ শতাংশ শিশু নিয়মিত দিনের বেলা ঘুমায়। এক থেকে দুই বছরের শিশুদের মধ্যে এই হার প্রায় ৯২ শতাংশ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস কমতে থাকে। তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের প্রায় অর্ধেক এবং স্কুলগামী শিশুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখনও দুপুরে ঘুমায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অনেক অভিভাবক রাতে ভালো ঘুমের আশায় দুপুরের ঘুম বন্ধ করে দেন। কিন্তু এতে উল্টো সমস্যা হতে পারে। শিশু অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লে রাতে আরও অস্থির হয়ে যেতে পারে।

নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে নিয়মিত সময় মেনে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, আলো কমিয়ে দেওয়া, শান্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং ঘুমানোর আগে গল্প পড়া বা শান্ত কোনো কাজ করা শিশুদের ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে।
এ ছাড়া ঘুমানোর আগে উত্তেজনাপূর্ণ ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার না করা এবং দিনের শুরুতে প্রাকৃতিক আলোতে সময় কাটানো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের সামনে বড়রাও যেন ঘুমকে গুরুত্ব দেন। কারণ শিশুরা পরিবারের সদস্যদের দেখেই ঘুমের অভ্যাস শেখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















