দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে দ্রুত কমে যাওয়া জন্মহার এখন বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনকে উৎসাহিত করতে তারা নগদ সহায়তা, শিক্ষা ব্যয় বহন এবং শিশু যত্ন সুবিধা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কর্মীদের জন্য শিশু লালন-পালন সহায়তা বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হুয়াচেওন: জনসংখ্যা সংকট কাটিয়ে জন্মহারের উত্থান
দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তর সীমান্তের কাছে অবস্থিত পাহাড়ি জেলা হুয়াচেওন জনসংখ্যা সংকটে থাকা সত্ত্বেও জন্মহার বাড়াতে সফল হয়েছে। প্রায় ২৩ হাজার মানুষের এই ছোট জেলা একসময় বয়স্ক জনসংখ্যা ও শিল্পের অভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিবেচিত হয়েছিল।
কিন্তু এখন সেখানে জন্মহার দেশের গড়ের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গড় জন্মহার ছিল ০.৮, যা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। সেখানে হুয়াচেওনে একজন নারীর গড়ে ১.২১টি সন্তান জন্ম হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে জেলার গভর্নর চোই মুন-সুনের উদ্যোগ। তিনি ২০১৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই “শিশু লালন-পালনের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ হুয়াচেওন” গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, সড়ক বা সেতু নির্মাণ দেরি হলেও শিশুদের শিক্ষা কখনো পিছিয়ে থাকা উচিত নয়।
শিক্ষা ব্যয়ে বড় সহায়তা
হুয়াচেওনের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা। জেলার বাসিন্দাদের সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে তাদের পুরো টিউশন ফি বহন করে স্থানীয় সরকার। পাশাপাশি বাসাভাড়া বাবদ সর্বোচ্চ ৬ লাখ ওন পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়, যদি শিক্ষার্থীর পরিবার অন্তত তিন বছর ধরে হুয়াচেওনে বসবাস করে।
এছাড়া বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে শিক্ষার্থীদের ভ্রমণ ও জীবনযাত্রার ব্যয়েও সহায়তা দেওয়া হয়।
শুধু অর্থ সহায়তাই নয়, শিশু লালন-পালনকারী পরিবারগুলোর জন্য নতুন আবাসন নির্মাণ করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একটি শিক্ষা কেন্দ্রও গড়ে তোলা হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলো এখন “হুয়াচেওন মডেল” নামে পরিচিত হচ্ছে এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার তা অনুসরণ করার চেষ্টা করছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নীতি
গভর্নর চোই মুন-সুনের এই নীতির পেছনে তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় একসময় তিনি স্কুলের পরীক্ষায় বসতে পারেননি, কারণ টিউশন ফি দিতে না পারায় শিক্ষক তাঁর উত্তরপত্র নিয়ে নিয়েছিলেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে কারও শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। তাঁর লক্ষ্য এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সবাই সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ পাবে।
তাইওয়ানে জন্মহার বাড়াতে নগদ প্রণোদনা
তাইওয়ানেও জন্মহার দ্রুত কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে দেশটির জন্মহার নেমে আসে ০.৮৯-এ। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার পরিবারগুলোকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে বড় অঙ্কের নগদ সহায়তা ঘোষণা করছে।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় অঞ্চল ইউনলিন কাউন্টি এ ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ। ২০০৮ সাল থেকে সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের চেয়ে বেশি হওয়ায় স্বাভাবিক জনসংখ্যা হ্রাস শুরু হয়। ২০২৩ সালে সেখানে জন্মের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৩,২০৬-এ, যা ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন।
২০২৪ সালে ‘ড্রাগনের বছর’ উপলক্ষে কাউন্টি সরকার নতুন জনসংখ্যা বৃদ্ধিমুখী নীতি চালু করে। চীনা রাশিচক্রে এই বছরকে অত্যন্ত শুভ মনে করা হয়।
এই নীতির আওতায় শিশু জন্মের জন্য দেওয়া অনুদান দুই থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরিবারগুলোকে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার নিউ তাইওয়ান ডলার পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়, যা দেশটির অন্যতম বড় আর্থিক প্রণোদনা।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মিলিয়ে ১০ হাজার শিশুর জন্ম নিশ্চিত করা। লক্ষ্যটি পূরণও হয়েছে। ২০২৪ সালে সেখানে জন্ম হয় ৬,৯২৩টি শিশুর এবং ২০২৫ সালে জন্ম হয় ৪,৫৪৬টি শিশুর। ফলে ইউনলিনে মাথাপিছু জন্মহার তাইওয়ানের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়ে ওঠে।
পরিবারের অভিজ্ঞতা
ইউনলিনের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী মা শিয়ে চিয়া-সেন বলেন, শিশু কেন্দ্র ও ডে-কেয়ার সুবিধা প্রতি বছরই উন্নত হচ্ছে। তাঁর চার ও দুই বছর বয়সী দুটি ছেলে রয়েছে এবং তিনি বর্তমানে তৃতীয় সন্তানের প্রত্যাশায় আছেন।
২০২২ সালে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে ইউনলিনে এসে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয় সরকারের সহায়তা তাদের পরিবার গড়তে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ
জন্মহার কমে যাওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে অনেক কোম্পানি কর্মীদের সন্তান জন্মে আর্থিক সহায়তা দিতে শুরু করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার মাঝারি আকারের শিল্পগোষ্ঠী বুয়ুং গ্রুপ ২০২৪ সালে একটি কর্মসূচি চালু করে, যেখানে কর্মীদের প্রতিটি নবজাতক সন্তানের জন্য ১০ কোটি ওন দেওয়া হয়। এর ফলে কর্মীদের মধ্যে সন্তান জন্মের সংখ্যা বাড়ায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩৪ কোটি ওন।
তাইওয়ানের বড় ইলেকট্রনিক্স নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন হাই প্রিসিশন ইন্ডাস্ট্রি, যা ফক্সকন নামেও পরিচিত, ২০২০ সালে তাদের শিশু যত্ন ভাতা ব্যবস্থা বাড়ায়। কর্মীদের সন্তানের বয়স ছয় বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে ১৫ হাজার নিউ তাইওয়ান ডলার দেওয়া হয়।
শুধু ভাতা নয়, আরও সমন্বিত সহায়তার প্রয়োজন
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র নগদ ভাতা দিয়ে জন্মহার বাড়ানো সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক পরিবার সন্তানের শিক্ষার পেছনে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করে, ফলে অর্থ সহায়তা যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে না।
তাইওয়ানের অ্যাকাডেমিয়া সিনিকার গবেষক ইয়াং ওয়েন-শান মনে করেন, জন্মহার বাড়াতে আরও বিস্তৃত সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে উর্বরতা চিকিৎসা, ডিম্বাণু সংরক্ষণসহ অন্যান্য প্রজনন সহায়তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















