ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে নতুন ধরনের অস্থিরতা। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে একটি বিষয়—বিশ্বের দুই বড় আর্থিক সূচক শেয়ারবাজার ও বন্ড বাজার একেবারে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শেয়ারবাজারগুলো দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে বন্ড বাজারে এখনো রয়ে গেছে গভীর উদ্বেগ ও সতর্কতা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার এবং সরকারি বন্ডের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে শেয়ারবাজারে সেই আতঙ্কের প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। বরং বিনিয়োগকারীরা ধরে নিচ্ছেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধের মধ্যেও মুনাফা ধরে রাখতে পারবে।
শেয়ারবাজারে দ্রুত পুনরুদ্ধার
বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধের কারণে বড় ধাক্কা খেলেও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মার্চের শেষ দিকে বড় পতনের পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজার আবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে শক্তিশালী উত্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, বাজার যেন যুদ্ধকে খুব দ্রুত ভুলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি সূচক জানুয়ারির উচ্চতা থেকে প্রায় ৯ শতাংশ নেমে গেলেও মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে আগের অবস্থান ফিরে পায়। গত কয়েক দশকের বড় পতনগুলোর তুলনায় এটিই সবচেয়ে দ্রুত পুনরুদ্ধার বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ, শুল্কনীতি, ইউক্রেন সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা এখনো করপোরেট আয়ের ওপর আস্থা রাখছেন।
বন্ড বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
অন্যদিকে বন্ড বাজারের চিত্র অনেক বেশি সতর্ক। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেলের দাম বাড়তে থাকে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয় এবং সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়। এতে সরকারি ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের দাম কমতে শুরু করে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। সুদের হার বাড়লে এসব বন্ডের দাম দ্রুত কমে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি এড়াতে বেশি সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজার ভবিষ্যতের মুনাফার সম্ভাবনা দেখে আশাবাদী হলেও বন্ড বাজার মূলত ঝুঁকি ও মূল্যস্ফীতিকে গুরুত্ব দেয়। আর সেই কারণেই দুই বাজারের আচরণ এখন সম্পূর্ণ আলাদা।
মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। যদিও ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে, তবু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
তারপরও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখনো মার্কিন ট্রেজারিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে অনেক অর্থ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজারে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠিন সময়
বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও এখন কঠিন এক দ্বিধায় রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার সুদের হার বেশি থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাপান ও যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সুদের হার পরিবর্তনে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। তখন শেয়ারবাজারের বর্তমান আশাবাদও বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















