০৬:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় একবিংশ শতাব্দীর সেরা ১০০ বই: শীর্ষে এলেনা ফেরান্তের ‘মাই ব্রিলিয়ান্ট ফ্রেন্ড’ সত্যের অবক্ষয়, বিভেদের রাজনীতি এবং নতুন তথ্যযুদ্ধের যুগ নতুন বিপর্যয়ে থমকে গেল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, ভূমিকম্পের ধাক্কায় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনিশ্চিত বিশ্বব্যাংকের ১.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা: খাদ্য নিরাপত্তা ও জরুরি সুরক্ষায় নতুন ভরসা বাংলাদেশের নতুন ৭ শিশুর মৃত্যু, হামে মৃতের সংখ্যা ৭০৯ ছাড়াল নিখোঁজের পর কুষ্টিয়ায় নদী থেকে উদ্ধার প্রতিবন্ধী যুবকের মরদেহ গাজীপুরে ডেঙ্গুতে ৯ বছরের শিশুর মৃত্যু সিরাজগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ: পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও, বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন গ্রামবাসী নিষ্প্রভ উদারনীতির সংকট: কেন কেন্দ্রপন্থাকে আবার বিদ্রোহী হতে হবে বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের গোলঝড়, নিউ জিল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে শীর্ষে রেড ডেভিলস

দিল্লির দেওয়ালে শিল্পের নতুন ইতিহাস: দশ বছরে লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্টের অনন্য রূপান্তর

দিল্লির লোধি কলোনির নীল, ধূসর আর রঙিন দেয়ালগুলো যেন এখন শহরের এক জীবন্ত ক্যানভাস। কোথাও পানির সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলা লেখা, কোথাও শিশুদের শেখানো মায়েদের প্রতিকৃতি, আবার কোথাও বিমূর্ত সাদা-কালো রেখা বা বৃষ্টিভেজা জানালার মতো ছড়িয়ে থাকা রঙিন ছায়া। এক দশক আগে শুরু হওয়া এই শিল্পযাত্রা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

দশ বছর পূর্ণ হওয়া লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্ট এখন শুধু রাস্তার শিল্পের প্রদর্শনী নয়, বরং শহুরে সংস্কৃতি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার এক সফল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

শহরের দেয়ালে শিল্পের নতুন অধ্যায়
দুই হাজার পনের সালে কয়েকজন শিল্পপ্রেমী বন্ধু মিলে দিল্লির লোধি কলোনিতে একটি নতুন ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল শহরের দেয়ালগুলোকে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের দখল থেকে ফিরিয়ে এনে সেখানে জনসাধারণের শিল্প তুলে ধরা।

দশ বছরে এই এলাকায় চিত্রিত দেয়ালচিত্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছেষট্টিতে। সম্প্রতি যোগ হয়েছে আরও ছয়টি নতুন কাজ। এর মধ্যে একটি যৌথ দেয়ালচিত্রে পানির সংকটকে কেন্দ্র করে শিল্পীরা পুরোনো দিল্লির সাইনবোর্ড আঁকিয়েদের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের আলাপচারিতা থেকে ধারণা নিয়েছেন।

শিল্পীদের মতে, শহরের দেয়াল শুধু রঙে সাজানোর জন্য নয়; এগুলো হতে পারে মানুষের গল্প, উদ্বেগ এবং স্বপ্ন প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

শিল্প, সরকার ও সমাজের মিলিত উদ্যোগ
এই প্রকল্পের শুরুটা ছিল বন্ধুবান্ধবের উদ্যোগে হলেও এর বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, দূতাবাস এবং বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায়। কারণ জনপরিসরের শিল্পকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন ছিল প্রশাসন ও সমাজের সমর্থন।

Taking back the walls at Lodhi Colony - The Hindu

প্রথমদিকে অনুমতি পেতে শিল্পীদের পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত যেতে হয়েছে। এক সময় দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরের দেয়ালে মহাত্মা গান্ধীর বিশাল প্রতিকৃতি আঁকার অনুমতি চাইতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্কই পরে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হয়েছে।

তবে জনপরিসরে সংস্কৃতি নির্মাণ সহজ নয়। একই জায়গা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, সরকারি বিভাগ, শিল্পী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা একটি জটিল কাজ। সরকার বদলালে নতুন করে আলোচনাও শুরু করতে হয়। তবু আগের কাজের উদাহরণ থাকায় এখন অনেক ক্ষেত্রেই পথ সহজ হয়েছে।

সংস্কৃতি কূটনীতির নতুন ক্ষেত্র
লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্ট এখন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা এখানে এসে দেয়ালচিত্র তৈরি করছেন। অনেক সময় বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা সরকারই শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়।

এভাবেই শিল্পের মাধ্যমে গড়ে উঠছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক কূটনীতি। শহরের রাস্তায় তৈরি হওয়া এই শিল্পকর্ম বিদেশি প্রতিনিধিদেরও আকর্ষণ করছে এবং দিল্লিকে একটি বৈশ্বিক শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত করছে।

ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে জনশিল্প
লোধির সাফল্যের পর ভারতের বিভিন্ন শহরেও জনপরিসরের শিল্প প্রকল্প দ্রুত বাড়ছে। মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও গোয়ার নানা এলাকায় দেয়ালচিত্র তৈরি হয়েছে।

কেরালার কোচিতেও সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়েছে এক বৃহৎ দেয়ালচিত্র প্রকল্প। সেখানে উপকূলীয় জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে দীর্ঘ দেয়ালে—মৎস্যজীবী, ম্যানগ্রোভ রক্ষক এবং উপকূলরক্ষীদের জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে। শিল্পীরা মনে করেন, রাস্তার দেয়াল মানুষের মতভেদের মাঝখানে এক মধ্যম জায়গা তৈরি করতে পারে, যেখানে সবাই নিজেদের গল্প দেখতে পায়।

Taking back the walls at Lodhi Colony - The Hindu

মানুষের জন্য উন্মুক্ত এক শিল্পভূমি
এই প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। শিল্পীরা কোনো এলাকায় কাজ শুরু করার আগে সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন, ইতিহাস ও গল্প সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

লোধি কলোনিতে এমনই এক দেয়ালচিত্র তৈরি হয়েছিল যেখানে প্রায় একশো বাসিন্দা নিজ হাতে রঙ তুলেছিলেন। আবার কিছু দেয়ালচিত্রে স্থানীয় নারীদের মুখ বা পাড়ার মানুষের গল্পও উঠে এসেছে।

আয়োজকদের মতে, লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্ট শুধু একটি শিল্প এলাকা নয়; এটি এমন একটি পরীক্ষাগার, যেখানে শহরের মানুষ নিজেদের জায়গা নতুনভাবে চিনতে শেখে। শহরের দেয়াল যে সবার—এই ধারণাটিই এখানে সবচেয়ে বড় শক্তি।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় একবিংশ শতাব্দীর সেরা ১০০ বই: শীর্ষে এলেনা ফেরান্তের ‘মাই ব্রিলিয়ান্ট ফ্রেন্ড’

দিল্লির দেওয়ালে শিল্পের নতুন ইতিহাস: দশ বছরে লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্টের অনন্য রূপান্তর

০২:০০:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

দিল্লির লোধি কলোনির নীল, ধূসর আর রঙিন দেয়ালগুলো যেন এখন শহরের এক জীবন্ত ক্যানভাস। কোথাও পানির সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলা লেখা, কোথাও শিশুদের শেখানো মায়েদের প্রতিকৃতি, আবার কোথাও বিমূর্ত সাদা-কালো রেখা বা বৃষ্টিভেজা জানালার মতো ছড়িয়ে থাকা রঙিন ছায়া। এক দশক আগে শুরু হওয়া এই শিল্পযাত্রা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

দশ বছর পূর্ণ হওয়া লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্ট এখন শুধু রাস্তার শিল্পের প্রদর্শনী নয়, বরং শহুরে সংস্কৃতি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার এক সফল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

শহরের দেয়ালে শিল্পের নতুন অধ্যায়
দুই হাজার পনের সালে কয়েকজন শিল্পপ্রেমী বন্ধু মিলে দিল্লির লোধি কলোনিতে একটি নতুন ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল শহরের দেয়ালগুলোকে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের দখল থেকে ফিরিয়ে এনে সেখানে জনসাধারণের শিল্প তুলে ধরা।

দশ বছরে এই এলাকায় চিত্রিত দেয়ালচিত্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছেষট্টিতে। সম্প্রতি যোগ হয়েছে আরও ছয়টি নতুন কাজ। এর মধ্যে একটি যৌথ দেয়ালচিত্রে পানির সংকটকে কেন্দ্র করে শিল্পীরা পুরোনো দিল্লির সাইনবোর্ড আঁকিয়েদের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের আলাপচারিতা থেকে ধারণা নিয়েছেন।

শিল্পীদের মতে, শহরের দেয়াল শুধু রঙে সাজানোর জন্য নয়; এগুলো হতে পারে মানুষের গল্প, উদ্বেগ এবং স্বপ্ন প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

শিল্প, সরকার ও সমাজের মিলিত উদ্যোগ
এই প্রকল্পের শুরুটা ছিল বন্ধুবান্ধবের উদ্যোগে হলেও এর বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, দূতাবাস এবং বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায়। কারণ জনপরিসরের শিল্পকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন ছিল প্রশাসন ও সমাজের সমর্থন।

Taking back the walls at Lodhi Colony - The Hindu

প্রথমদিকে অনুমতি পেতে শিল্পীদের পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত যেতে হয়েছে। এক সময় দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরের দেয়ালে মহাত্মা গান্ধীর বিশাল প্রতিকৃতি আঁকার অনুমতি চাইতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্কই পরে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হয়েছে।

তবে জনপরিসরে সংস্কৃতি নির্মাণ সহজ নয়। একই জায়গা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, সরকারি বিভাগ, শিল্পী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা একটি জটিল কাজ। সরকার বদলালে নতুন করে আলোচনাও শুরু করতে হয়। তবু আগের কাজের উদাহরণ থাকায় এখন অনেক ক্ষেত্রেই পথ সহজ হয়েছে।

সংস্কৃতি কূটনীতির নতুন ক্ষেত্র
লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্ট এখন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা এখানে এসে দেয়ালচিত্র তৈরি করছেন। অনেক সময় বিদেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা সরকারই শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়।

এভাবেই শিল্পের মাধ্যমে গড়ে উঠছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক কূটনীতি। শহরের রাস্তায় তৈরি হওয়া এই শিল্পকর্ম বিদেশি প্রতিনিধিদেরও আকর্ষণ করছে এবং দিল্লিকে একটি বৈশ্বিক শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত করছে।

ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে জনশিল্প
লোধির সাফল্যের পর ভারতের বিভিন্ন শহরেও জনপরিসরের শিল্প প্রকল্প দ্রুত বাড়ছে। মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও গোয়ার নানা এলাকায় দেয়ালচিত্র তৈরি হয়েছে।

কেরালার কোচিতেও সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়েছে এক বৃহৎ দেয়ালচিত্র প্রকল্প। সেখানে উপকূলীয় জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে দীর্ঘ দেয়ালে—মৎস্যজীবী, ম্যানগ্রোভ রক্ষক এবং উপকূলরক্ষীদের জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে। শিল্পীরা মনে করেন, রাস্তার দেয়াল মানুষের মতভেদের মাঝখানে এক মধ্যম জায়গা তৈরি করতে পারে, যেখানে সবাই নিজেদের গল্প দেখতে পায়।

Taking back the walls at Lodhi Colony - The Hindu

মানুষের জন্য উন্মুক্ত এক শিল্পভূমি
এই প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। শিল্পীরা কোনো এলাকায় কাজ শুরু করার আগে সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন, ইতিহাস ও গল্প সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

লোধি কলোনিতে এমনই এক দেয়ালচিত্র তৈরি হয়েছিল যেখানে প্রায় একশো বাসিন্দা নিজ হাতে রঙ তুলেছিলেন। আবার কিছু দেয়ালচিত্রে স্থানীয় নারীদের মুখ বা পাড়ার মানুষের গল্পও উঠে এসেছে।

আয়োজকদের মতে, লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্ট শুধু একটি শিল্প এলাকা নয়; এটি এমন একটি পরীক্ষাগার, যেখানে শহরের মানুষ নিজেদের জায়গা নতুনভাবে চিনতে শেখে। শহরের দেয়াল যে সবার—এই ধারণাটিই এখানে সবচেয়ে বড় শক্তি।