মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে অজেয় শক্তিধর আমেরিকার সেই কল্পচিত্র, যা দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সংঘাত শুরু করেছেন, তার প্রতিক্রিয়া এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতেই বড় আঘাত
যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। তবে এর পর কী ঘটতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সংঘাতের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে এবং আরও হতাহতের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান পাল্টা হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত
ইরানের হামলা শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সৌদি আরবের মতো দেশেও হামলা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। বিমানবন্দর, হোটেল, তথ্যকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে পুরো অঞ্চলে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর বড় প্রভাব পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এখন সংকটে
উপসাগরীয় অঞ্চল শুধু তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতি, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো শহরের বিশাল বিমানবন্দরগুলো বিশ্বব্যাপী যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু যুদ্ধের কারণে এসব বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ আটকে পড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিকল্পনার অভাব নিয়ে প্রশ্ন
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন এবং কীভাবে এটি শুরু হলো। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কখনও বলা হয়েছে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, আবার কখনও দাবি করা হয়েছে এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
এমনকি ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের পর ক্ষমতায় কে আসবে সে বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই ধরনের বক্তব্য অনেক বিশ্লেষকের কাছে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে।
যুদ্ধের ছায়া ছড়াচ্ছে আরও দূরে
যুদ্ধের বিস্তারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ভূপাতিত করেছে ন্যাটো বাহিনী। আজারবাইজানের আকাশসীমায়ও ড্রোন প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।
এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

অজেয় শক্তির ধারণা কি ভেঙে পড়ছে
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার ওপর বিশ্বের কোনো প্রভাব পড়ে না। কিন্তু বর্তমান সংঘাত দেখাচ্ছে, বাস্তবতা ভিন্ন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে একতরফা শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত কখনও কখনও বড় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ হয়তো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে ক্ষমতার কল্পনার সংঘর্ষও তুলে ধরছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















