“একটি দেশের ভূগোল জানলে তার পররাষ্ট্রনীতি অনুমান করা যায়”—ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের এই বক্তব্য প্রায়ই উদ্ধৃত হয়। তবুও ভারতের গত আশি বছরের পররাষ্ট্রনীতির পথচলার সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি—যাকে কখনও নিরপেক্ষতা, কখনও বহুমুখিতা, কখনও গ্লোবাল সাউথ সংহতি বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলা হয়—প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

ভারতের ভূগোল তার ইতিহাস নির্ধারণ করে
ভারতের বিশাল ভূখণ্ড ও জনসংখ্যা তাকে সবসময় বৈশ্বিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী করে তোলে। দক্ষিণ দিকে সরু হয়ে আসা এবং তিন দিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত ভারতীয় উপদ্বীপ দেশটিকে দিয়েছে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক ঐতিহ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক, যা আজও অব্যাহত।
তবে ভারতের স্থলভাগের প্রতিবেশই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তর ও পূর্বে চীন এবং উত্তর ও পশ্চিমে পাকিস্তান দেশটিকে ঘিরে রেখেছে।
এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে কারণ ভারতের পূর্ব দিকের সামুদ্রিক প্রতিবেশ—ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে—যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রয়েছে, কিন্তু স্থলভাগের প্রতিবেশে সেই সমীকরণ নেই।
এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক সীমানা—উত্তরে হিন্দুকুশ ও হিমালয় এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর—ভারতকে কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেয় না। বৈশ্বিক উচ্চপর্যায়ের আসরে জায়গা করে নেওয়ার ভারতের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রায়ই প্রতিবেশী সংকটে বাধাগ্রস্ত হয় বা মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়।
এই কারণেই ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনাকারীরা শুরু থেকেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি শুধুমাত্র ১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলনের পর নিরপেক্ষ আন্দোলন গঠনের ফল নয়; বরং ভারতের স্বাধীনতার আগেই, ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এবং পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে প্রথম যুদ্ধের আগেই এই নীতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
১৯৪৬ সালে গণপরিষদে ভাষণে তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতিগুলো তুলে ধরেন। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি ভারতের অবস্থান ছিল তিনটি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে—জোট রাজনীতি থেকে বিরত থাকা (নিরপেক্ষতা), ঔপনিবেশিক, সাম্রাজ্যবাদী ও বর্ণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইরত দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি এবং নিপীড়িতদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা।
তিনি বলেন, “আমরা যতটা সম্ভব এমন শক্তির রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাই, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যা অতীতে যুদ্ধ ডেকে এনেছে এবং ভবিষ্যতেও আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে… আমরা এমন একটি ‘এক পৃথিবী’-এর জন্য কাজ করব, যেখানে স্বাধীন মানুষ স্বাধীনভাবে সহযোগিতা করবে এবং কোনো শ্রেণি অন্যকে শোষণ করবে না।”
এক দশক পরে নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম হয়, যা বান্দুং সম্মেলনের দশটি নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই নীতিগুলোর মধ্যে ছিল সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান, সমতা, হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতিসংঘ সনদের প্রতি আনুগত্য।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে ভারত এই নীতিগুলো প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী কয়েক দশকে ভারত একই ধরনের উপনিবেশ-উত্তর দৃষ্টিভঙ্গির দেশগুলোর জোট গঠনে অগ্রণী ছিল। ১৯৬৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন গঠন, এরপর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রুপ অব ৭৭ গঠন এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’ ও ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা’ ধারণার বিকাশ—সবই ভারতের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতিফলন।

আদর্শবাদ থেকে বাস্তবনীতিতে
এরপর থেকে বৈশ্বিক নিরপেক্ষ আন্দোলনের গুরুত্ব কমে এলেও ভারতের নিরপেক্ষতার ধারণা টিকে আছে, কারণ এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আরও নমনীয় হয়েছে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলে বাজার ও জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা লাগে, যা ভারতের অর্থনীতিকে সংকটে ফেলে। তখন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন—অর্থনৈতিক সংস্কার, ‘লুক ইস্ট’ নীতি, একমেরু বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক স্থাপন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
এই পদক্ষেপগুলো মূলত প্রতিরক্ষা সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতি শক্তিশালী করার প্রয়োজন থেকে নেওয়া হয়েছিল। এগুলো নিরপেক্ষতা ত্যাগ নয়, বরং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রকাশ।
১৯৯৫ সালে মহাত্মা গান্ধী স্মারক বক্তৃতায় রাও বলেন, “প্রচলিত অর্থে নিরপেক্ষতা হয়তো আগের মতো অর্থ বহন করে না, কিন্তু ন্যায় ও যুক্তির নীতি হিসেবে এটি আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক, যতটা ছিল আগে… এবং এটি ভারতের স্বাধীনতার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।”
এরপর গুজরাল, বাজপেয়ী ও মনমোহন সিংয়ের সময়েও রাও-এর শুরু করা পররাষ্ট্রনীতির ধারা অব্যাহত থাকে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি, চীনের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদ সত্ত্বেও প্রতিবেশী সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা।
নিরপেক্ষতা থেকে সাময়িক বিচ্যুতি
২০১৪ সালে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার মেয়াদের শুরুতেই আরও বাস্তববাদী ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেন, যেখানে ভারত একটি “নেতৃত্বশীল শক্তি” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের “ইতিহাসের দ্বিধা” দূর হয়েছে।
একই বছরে তিনি ভেনেজুয়েলায় অনুষ্ঠিত নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে অংশ নেননি—যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ভারত ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি শূন্যে নামিয়ে আনে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-অস্ট্রেলিয়া-
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি—লেমোয়া (২০১৬), কমকাসা (২০১৮) এবং বেকা (২০২০)—স্বাক্ষর করা হয়।
এই সময় মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত আবারও কম জোটনির্ভর এবং বেশি স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক অবস্থানে ফিরে এসেছে, একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে।

২০২০ থেকে ২০২৫: পাঁচটি ধাক্কা
এই সময়ের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
কোভিড মহামারি ভারতের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা প্রকাশ করে, যখন বিভিন্ন দেশ আরও সুরক্ষাবাদী হয়ে ওঠে।
চীনের সঙ্গে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা, গালওয়ান সংঘর্ষ এবং দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থা ভারতের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারকে সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে সরিয়ে দেয়।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ভারতের খাদ্য, জ্বালানি ও সার নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ভারতের আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি—উচ্চ শুল্ক আরোপ, বাণিজ্য চাপ, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা—ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
উপসংহার
এই সব ধাক্কা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ভারতকে তার প্রতিষ্ঠাতাদের নির্ধারিত স্বতন্ত্র পথেই এগোতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতি ভূগোলসহ বিভিন্ন অপরিবর্তনীয় বাস্তবতায় প্রভাবিত হলেও কৌশলগতভাবে ভারতের উচিত নিজের বিকল্প বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গিকে সংকুচিত না করা।
একটি বিশ্বে যেখানে বড় শক্তিগুলো নিজেরাই নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ভেঙে দিচ্ছে এবং ভারতের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, সেখানে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন আর শুধু একটি বিকল্প নয়—এটি প্রায় বাধ্যতামূলক বাস্তবতা।
সুহাসিনী হায়দার 


















