যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান পদ থেকে ক্রিস্টি নোয়েমকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে নীতির চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত আস্থাই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক এক কংগ্রেস শুনানিতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করার পরপরই তার পদচ্যুতি কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়।
কংগ্রেস শুনানিতে মন্তব্যই কাল হলো
গত সপ্তাহে কংগ্রেসের এক শুনানিতে নোয়েমকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে পরিচালিত একটি সরকারি বিজ্ঞাপন প্রচারণা সম্পর্কে। সেই প্রচারণায় তাকে কেন্দ্র করেই বার্তা তুলে ধরা হয়েছিল।
নোয়েম জবাবে জানান, দেশের মানুষকে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং এই প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই এ নিয়ে তাদের আলোচনা হয়েছিল। তার বক্তব্যে বোঝা যায়, পুরো বিজ্ঞাপন পরিকল্পনার বিষয়ে ট্রাম্প অবগত ছিলেন এবং অনুমোদনও দিয়েছিলেন।
কিন্তু এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাম্প আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি ওই বিজ্ঞাপন চুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এই বক্তব্যে প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং দ্রুতই নোয়েমের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

গুরুতর বিতর্কেও টলেননি, কিন্তু ‘দায় চাপানো’ মেনে নেননি ট্রাম্প
নোয়েমের সময়ে নানা বিতর্ক তৈরি হলেও সেগুলো তার পদচ্যুতির কারণ হয়নি। মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুই নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা কিংবা আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ—এসব সত্ত্বেও তিনি পদে বহাল ছিলেন।
এমনকি এক নার্সকে গুলিতে হত্যার ঘটনার পর তাকে ‘দেশীয় সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া এবং অস্ত্র দেখানোর অভিযোগও পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। তবুও তখন তাকে সরানো হয়নি।
কিন্তু কংগ্রেস শুনানিতে ট্রাম্পকে বিজ্ঞাপন প্রচারণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে ইঙ্গিত দেওয়াকেই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের এক ধরনের ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করা হিসেবে দেখা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনে আনুগত্যই প্রধান মানদণ্ড
সাবেক সীমান্ত সুরক্ষা কমিশনার গিল কেরলিকাওস্কে বলেন, একজন কর্মকর্তার জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ম হলো নিজের ঊর্ধ্বতনকে প্রকাশ্যে দোষারোপ না করা। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনে এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা।

নীতি বদল নয়, শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন
নোয়েমকে সরালেও প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। অবৈধ অভিবাসন রোধ ও ব্যাপক বহিষ্কার অভিযানের নীতি আগের মতোই চলবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
নোয়েমের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ওকলাহোমার রিপাবলিকান সিনেটর মার্কওয়েইন মুলিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে একই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন দায়িত্বে কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রধান হিসেবে মুলিনকে এক কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একদিকে ট্রাম্পের আনুগত্য বজায় রাখা, অন্যদিকে অর্থসংকট ও মনোবলহীনতায় ভোগা বিশাল নিরাপত্তা দপ্তরকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা—এই দুই চ্যালেঞ্জই সামনে থাকবে।
সাবেক স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা সচিব জ্যানেট নাপোলিতানো মনে করেন, এই দপ্তর পরিচালনা করা শুধু রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি বিশাল প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত দায়িত্বের কাজ।
এদিকে নোয়েমের বিদায়ে দপ্তরের কিছু অংশে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হলেও অনেক কর্মকর্তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
![]()
অভিবাসন নীতি নিয়ে দূরত্বের রাজনীতি
পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ট্রাম্পের সেই কৌশলও তুলে ধরছে, যেখানে কোনো নীতি রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে তিনি তার দায় থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। অথচ একই সময়ে কঠোর অভিবাসন নীতিই তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে রয়ে গেছে।
মুলিনের সামনে এখন সেই নীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতরের অস্থিরতা সামাল দেওয়ার বড় দায়িত্বও এসে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















