টোকিও — ইরানে চলমান যুদ্ধ জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বসন্তকালে সুদের হার বাড়াবে কি না, সেই পূর্বাভাসকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়ছে, যা জাপানের মূল্যস্ফীতিকে কখনও ত্বরান্বিত করতে পারে আবার কখনও অর্থনীতিকে দুর্বল করে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমিয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে বাজারে সুদের হার বাড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। সুদহার বিনিময় বাজারের হিসাব অনুযায়ী মার্চ মাসের মুদ্রানীতি বৈঠকে সুদ বাড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এপ্রিল মাসে এই সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোটের ওপর বাজারের ধারণা, বসন্তের মধ্যে কোনো এক সময়ে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্চ ও এপ্রিলের সম্ভাবনা
গবেষণা প্রতিষ্ঠান টোটান রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের বৈঠকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৪ শতাংশ। অন্যদিকে এপ্রিল মাসে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশে।

এই দুই সম্ভাবনা মিলিয়ে দেখা যায়, বসন্তের মধ্যে সুদের হার বাড়তে পারে এমন সম্ভাবনা মোটামুটি ৬০ শতাংশের মতো।
তবে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা বাজারের এই পূর্বাভাস নিয়ে পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। তাদের মতে, সুদহার বিনিময় বাজারের ওঠানামা সবসময় অর্থনীতিবিদদের প্রকৃত প্রত্যাশা প্রতিফলিত করে না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাস্তবে এত বড় অংশের অর্থনীতিবিদ বসন্তে সুদের হার বাড়বে বলে ধারণা করছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
এপ্রিলের সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত
মার্চে সুদ বাড়ার সম্ভাবনা কম হলেও এপ্রিলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনো পরিষ্কার নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের কিছু কর্মকর্তার মতে, এখনই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে এপ্রিলের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে গেছে।
এর একটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত যদি দ্রুত শেষ হয়ে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা না লাগে, তাহলে সুদ বাড়ানোর পথ খোলা থাকতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তেলের দাম ও মুদ্রানীতির দ্বন্দ্ব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়লে তা জাপানের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে—এই প্রশ্ন নিয়ে ৪ মার্চ পার্লামেন্টে বক্তব্য দেন জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কাজুও উয়েদা।
তিনি দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।
প্রথম পরিস্থিতিতে, তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে। এতে মৌলিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে, তেলের উচ্চমূল্য মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
উয়েদা বলেন, এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে কোন পরিস্থিতি বাস্তবে প্রাধান্য পাবে।
ডিফ্লেশন যুগের পর নতুন বাস্তবতা

একসময় জাপান দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাসঙ্কোচনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সেই সময় তেলের দাম বাড়লেও মূল উদ্বেগ ছিল অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়া। তাই তখন সুদের হার বাড়ানোর প্রশ্নই উঠত না।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। জাপানে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ২ শতাংশের বেশি হচ্ছে। ফলে তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং দাম বাড়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সুদের হার বাড়ানো একটি সম্ভাব্য নীতিগত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
দুর্বল ইয়েনের প্রভাব
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দুর্বলতা। ইয়েন অতিরিক্ত দুর্বল হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
এতে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে তাদের সতর্ক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দুর্বল ইয়েনকে ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র–জাপান শীর্ষ বৈঠকে এ বিষয়টি আলোচনায় আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তেলের দাম কত দূর যাবে
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে সুদের হার বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কারণ এতে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি বাড়ে।

বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজের অর্থনীতিবিদ রিউতারো কোনো বলেন, তেলের দাম যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা মন্দার ঝুঁকি বাড়ায়, তাহলে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত কঠোর মুদ্রানীতি থেকে বিরত থাকতে পারে।
তবে তিনি এখনো এপ্রিল মাসে সুদের হার বাড়ার পূর্বাভাস পরিবর্তন করেননি। তার মতে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
যুদ্ধের স্থায়িত্বই মূল প্রশ্ন
তেলের দাম ভবিষ্যতে কোথায় যাবে, তা মূলত নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ হয়, তাহলে তেলের বাজার স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘ হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেও এখনো নিশ্চিত নয় পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে।

অনিশ্চয়তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত
এই অনিশ্চয়তার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্ভবত খুব সতর্ক অবস্থান নেবে। তারা হয়তো কেবল এটুকুই জানাবে যে বসন্তকালে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিত নয়, তাই অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের পক্ষেও স্পষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে বাজারে আপাতত একটি ধারণাই প্রাধান্য পাচ্ছে—বসন্তকালে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেটি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















