মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ভারতের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ভারতের নির্ভরতা বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে দেশের প্রধান শেয়ার সূচক সেনসেক্সে উল্লেখযোগ্য চাপ দেখা গেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক
ভারতের পশ্চিম উপকূলের বিপরীতে আরব সাগরের ওপারে অবস্থিত আরব উপদ্বীপ। এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।
মার্চের শুরুতে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে প্রায় ২০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করে। এতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাগরিকদেরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এই হামলার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব দ্রুত আর্থিক বাজারেও পড়ে।

ভারতের শেয়ারবাজারে চাপ
সংঘাতের কারণে ভারতীয় শেয়ারবাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বন্দর পরিচালনা ও অবকাঠামো খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে।
ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বন্দর মুন্দ্রাসহ দেশের ১৫টি বন্দর পরিচালনাকারী আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোনের শেয়ারে বড় পতন দেখা গেছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বহু নির্মাণ প্রকল্পে জড়িত লারসেন অ্যান্ড টুব্রো কোম্পানির শেয়ারেও বিক্রি বেড়েছে।
এছাড়া তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের কোম্পানিগুলোও চাপের মুখে পড়েছে।
মার্চের শুরু থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সেনসেক্স সূচক প্রায় ২ দশমিক ৯১ শতাংশ কমে যায়। যদিও এই পতন জাপানের নিক্কেই সূচকের ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকের ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ পতনের তুলনায় কম।
তবে ভারতের সেনসেক্স গত সপ্তাহে প্রায় ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে যায়। এটি রপ্তানি ও বিনিয়োগ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির দিকে যায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দেন। তার মন্তব্যের পর মঙ্গলবার সেনসেক্স আগের দিনের তুলনায় ৬৩৯ দশমিক ৮২ পয়েন্ট বেড়ে ৭৮,২০৫ দশমিক ৯৮ পয়েন্টে বন্ধ হয়।

হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব
ইরান যুদ্ধের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। পারস্য উপসাগরে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সংঘাতের কারণে যদি পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচও বেড়ে যাবে। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাণিজ্য ও রপ্তানির ওপর ঝুঁকি
তেলের বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের পরই এই দেশটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। গত বছর ভারতের রপ্তানি মূল্য সেখানে পৌঁছায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

ভারত থেকে মূল্যবান ধাতু, ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ি এবং তেলজাত পণ্য আমিরাতে রপ্তানি হয়। এসব পণ্যবাহী জাহাজকেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে হয়, ফলে সেখানে অস্থিরতা বাণিজ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া সৌদি আরবও ভারতের বড় বাণিজ্য অংশীদার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির মোট গাড়ি রপ্তানির প্রায় ২৫ শতাংশ সৌদি আরবে যায় বলে অনুমান করা হয়।
প্রবাসী আয় ও অর্থনীতির ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কর্মী কাজ করেন। সেখানে প্রায় ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ভারতীয় নাগরিক বসবাস করছেন।
এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই প্রায় ৪৩ লাখ ভারতীয় রয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ। আবুধাবিতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
নির্মাণ, সেবা ও আর্থিক খাতে কর্মরত এসব প্রবাসী শ্রমিক দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠান। বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের পাঠানো অর্থ ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশের সমান।
![]()
অর্থনীতিবিদ শিলান শাহের মতে, এই প্রবাসী আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। যদি অঞ্চলের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করেন, তাহলে ভারতের চলতি হিসাব ভারসাম্যে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগ প্রবাহের গুরুত্ব
সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ উৎসও। অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতের উন্নয়নে ভারতের বিপুল অর্থের প্রয়োজন।
২০২৪ অর্থবছরে ভারতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। এই বিনিয়োগের পরিমাণ সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের পরেই অবস্থান করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই বিনিয়োগ প্রবাহও প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















