কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথমবারের মতো ম্যালেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন শনাক্তের লক্ষ্যে একটি নজরদারি গবেষণা শুরু করেছে আইসিডিডিআর,বি। মিয়ানমারে এ ধরনের পরজীবী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায় বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণা শুরু ও প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য সামনে রেখে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা শুরু করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। বিভিন্ন সরকারি ও মানবিক সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো ম্যালেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন দ্রুত শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা তৈরি করা।
এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এমন সময়ে, যখন প্রতিবেশী মিয়ানমারে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন ছড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই ধরনের পরজীবী বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তাহলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কর্মসূচি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ম্যালেরিয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পরজীবী
ম্যালেরিয়া একটি প্রাণঘাতী রোগ, যা মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এর সবচেয়ে মারাত্মক ধরন হলো প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপারাম। সাধারণত কার্যকর ওষুধের মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব হলেও যদি পরজীবী ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তাহলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়।
কক্সবাজারে কেন গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। এ অঞ্চলে মানুষের সীমান্ত পারাপার, ঘনবসতি এবং সীমিত নজরদারি ব্যবস্থার কারণে ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতি হিসেবে পরিচিত এই শিবিরগুলোতে বর্তমানে ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিবিরগুলোতে ম্যালেরিয়া পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ জন, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯১ জনে। যদিও মোট সংখ্যা এখনও তুলনামূলক কম, তবু এই প্রবণতা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
গবেষণার কার্যক্রম কীভাবে চলবে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এবং ব্র্যাকের সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি এই গবেষণা পরিচালনা করবে। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে রোগী অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হবে।

গবেষণার আওতায় নির্বাচিত ক্যাম্প ও নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ম্যালেরিয়া রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরজীবীর জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক চিকিৎসার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি চিকিৎসার পর রোগীর শরীর থেকে পরজীবী কত দ্রুত দূর হয়, তাও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে অব্যাহত সতর্কতা জরুরি। কক্সবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা গেলে শরণার্থী ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠীকেই সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে এবং কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে।
আইসিডিডিআর,বি-এর বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউর আলম বলেন, ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া যদি সময়মতো শনাক্ত করা না যায়, তবে তা অজান্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয়েছে। সময়মতো পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় ওষুধ সেবন করলে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৩০
বাংলাদেশের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কৌশল (২০২৪-২০৩০) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা এবং ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















