উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় ভারতে রান্নার গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশজুড়ে বাড়ি, ছাত্রাবাস, কারখানার ক্যান্টিন ও ছোট খাবারের দোকানগুলোতে। অনেক জায়গায় গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য চা, ভাজাপোড়া বা দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করতে হয় এমন খাবার কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাসও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অনেক পরিবার ও প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে একটি সিলিন্ডার দিয়ে যতদিন সম্ভব চলতে।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে এই রুটে ট্যাংকার চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ কমে গেছে।
ভারত তার মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে সেই প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও।
কম জ্বালানির খাবারে ঝুঁকছে মানুষ
গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য অনেক পরিবার ও রান্নাঘর এখন এমন খাবার বেছে নিচ্ছে যেগুলো দ্রুত রান্না করা যায় এবং কম আগুন লাগে। দীর্ঘ সময় ধরে সেদ্ধ করতে হয় বা গভীর তেলে ভাজতে হয় এমন খাবার এড়িয়ে চলা হচ্ছে।
অনেক জায়গায় একাধিক পদ রান্নার বদলে কেবল ভাত ও ডাল খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। গরম স্যুপের পরিবর্তে দই বা ঘোল দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও চা বা কফির বদলে লেবুর শরবত পরিবেশন করা হচ্ছে। ভাজা খাবারের বদলে সেদ্ধ বা ভাপানো খাবার দেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসের প্রতিটি সিলিন্ডার যত বেশি দিন ব্যবহার করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তন করা হচ্ছে।
ছাত্রাবাসে গ্যাস রেশনিং
ছাত্রাবাস ও পেইং গেস্ট বাসাগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। এসব জায়গায় সাধারণত খুব বেশি সিলিন্ডার মজুত থাকে না। ফলে সরবরাহ কমে গেলে দ্রুতই রান্নাঘরে গ্যাস রেশনিং শুরু করতে হয়।
বেঙ্গালুরুর পেইং গেস্ট মালিকদের সংগঠনের সভাপতি অরুণকুমার ডি টি জানিয়েছেন, অনেক পেইং গেস্ট রান্নাঘরে এখন শেষ সিলিন্ডার চলছে। অধিকাংশ জায়গায় মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনের গ্যাস মজুত আছে।
গ্যাসের ব্যবহার কমাতে অনেক ছাত্রাবাসে সাময়িকভাবে চা, কফি ও রুটি বানানো বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কারখানার ক্যান্টিনেও পরিবর্তন
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প কারখানার ক্যান্টিনেও। কর্মীদের খাবার সরবরাহ চালু রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের মেনু পরিবর্তন করেছে।
গুজরাটের একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ কারখানার ক্যান্টিন ইতোমধ্যে ভাজা খাবার বন্ধ করেছে। চায়ের বদলে দেওয়া হচ্ছে লেবুর পানি। গরম স্যুপের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে ঘোল।
যেসব কর্মী ক্যান্টিনের ভর্তুকিযুক্ত খাবারের ওপর নির্ভর করেন, তাদের কাছে পরিবর্তনগুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, খাবার সরবরাহ চালু রাখতে জ্বালানি সাশ্রয় করা জরুরি।
হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা
হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং রাস্তার খাবারের দোকানগুলো বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
পশ্চিম ভারতের হোটেল ও রেস্তোরাঁ সমিতির প্রতিনিধি প্রদীপ শেঠি জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মুম্বাই, পুনে, ঔরঙ্গাবাদ এবং নাগপুরে সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
দিল্লি, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশ থেকেও একই ধরনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি না হলে মুম্বাইয়ের প্রায় অর্ধেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ছোট খাবারের দোকানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের কাছে সাধারণত মাত্র এক বা দুইটি সিলিন্ডার থাকে।

খাবারের দোকানে সীমিত মেনু
দিল্লির কিছু এলাকায় ইতোমধ্যে খাবারের দোকানগুলো মেনু সীমিত করতে শুরু করেছে। অনেক রাস্তার দোকানে এখন কেবল ভাত ও ডাল পাওয়া যাচ্ছে।
একটি দোকানে হাতে লেখা নোটিশ টানানো হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, সেদিন কেবল ভাত ও ডালই পাওয়া যাবে। দিল্লি হাইকোর্টের ক্যান্টিনও সাময়িকভাবে গরম খাবার বন্ধ করে স্যান্ডউইচ পরিবেশন শুরু করেছে।
এভাবে কম জ্বালানি ব্যবহার করে রান্নাঘর চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় সরকারের পরিবর্তন
সংকট মোকাবিলায় ভারত সরকার জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবার ও জরুরি সেবাখাতকে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ভারতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৫ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক মিটার প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার হয়, যার প্রায় অর্ধেক আমদানি করা। আগে এর মধ্যে প্রায় ৬০ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক মিটার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসত।
নতুন সরবরাহ নীতিতে পরিবার ও যানবাহনের জ্বালানি সিএনজিকে শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সার কারখানাগুলো পাবে প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ। চা শিল্প ও বড় উৎপাদন খাত পাবে প্রায় ৮০ শতাংশ। ছোট শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্যও প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ রাখা হয়েছে।
এতে গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও বাণিজ্যিক রান্নাঘর ও শিল্পখাতে সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় দেশীয় রিফাইনারিগুলোকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করা হবে।
গ্যাস মজুত করে রাখার প্রবণতা ঠেকাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডার বুকিংয়ের মধ্যে অপেক্ষার সময় ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে।
আমদানি করা গ্যাস হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ করা হবে। হোটেল ও রেস্তোরাঁর আবেদন তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর একটি কমিটি পর্যালোচনা করবে।
বাণিজ্যিক সিলিন্ডার সরবরাহে বিধিনিষেধ
কিছু অঞ্চলে ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের নতুন বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। রাজস্থানে ডিলারদের এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্ণাটকেও অনেক রেস্তোরাঁ মালিক জানিয়েছেন, সিলিন্ডার সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে হতে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, রেস্তোরাঁ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভারতের পথে নতুন গ্যাসবাহী জাহাজ
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত এলপিজি নিয়ে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে ভারতের পথে রয়েছে। এসব চালান পৌঁছালে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।
দেশীয় রিফাইনারিগুলোতেও সর্বোচ্চ উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সরবরাহ ঘাটতি কমানো যায়।
সরকার সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত সিলিন্ডার কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো সিলিন্ডার অর্ডারের পর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
গ্যাসের দামও বাড়ছে
সরবরাহ সংকটের কারণে গ্যাসের দামও বাড়তে শুরু করেছে। দিল্লিতে একটি গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এখন ৯১৩ রুপি, যা আগের তুলনায় প্রায় ৬০ রুপি বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও তেল বিপণন কোম্পানিগুলো শুরুতে এর কিছু অংশ নিজেদের ওপর নিয়েছিল। সরকার তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৩০ হাজার কোটি রুপির সহায়তা ঘোষণা করেছে।
তবু যেসব পরিবার ইতোমধ্যে রান্নার অভ্যাস বদলাতে বাধ্য হয়েছে, তাদের জন্য বাড়তি দাম নতুন চাপ তৈরি করছে।
দূরের সংঘাতের প্রভাব রান্নাঘরে
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। ভারতে পৌঁছানো এলপিজির প্রায় ৯০ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে।
ফলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। ছাত্রাবাসের রান্নাঘর, রাস্তার খাবারের দোকান কিংবা কারখানার ক্যান্টিন—সব জায়গাতেই সেই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















