ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মজুত তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। মোট ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হবে, যাতে সরবরাহ সংকট কমে এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে।
যুদ্ধের ধাক্কায় তেলের বাজার অস্থির
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দ্রুতই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর হরমুজ প্রণালির আশপাশে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল প্রায় থমকে গেছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ এই প্রণালি দিয়ে যায়। তাই এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম হঠাৎ করেই দ্রুত বেড়ে যায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর দাম একসময় প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারেরও বেশি ছুঁয়ে যায়। পরে কিছুটা কমলেও বাজারে অস্থিরতা এখনও কাটেনি।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মজুত তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত
এই সংকট সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থার ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় মজুত তেল ছাড়ার উদ্যোগ।
এর আগে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল দুই হাজার বাইশ সালে। তখন ইউক্রেন যুদ্ধের পর ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হয়েছিল।
সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, বাজারে সরবরাহ ঘাটতির তাৎক্ষণিক প্রভাব কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে সংকট বাড়বে
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়া হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর।
কারণ এই প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে যায়, তার তুলনায় ৪০ কোটি ব্যারেল মাত্র প্রায় ২০ দিনের সরবরাহের সমান। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সংকট আবারও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিভিন্ন দেশের আলাদা পদক্ষেপ
বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে নিজেদের মজুত থেকেও তেল ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ঘোষণা দিয়েছেন, দেশটি শিগগিরই কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়বে।
তিনি জানান, বেসরকারি মজুত থেকে প্রায় ১৫ দিনের তেল এবং সরকারি মজুত থেকে আরও ৩০ দিনের তেল বাজারে আনা হবে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশও একই পদক্ষেপে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিকল্প উৎস থেকে বাজারে তেলের সরবরাহ ধরে রাখা।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয় তবে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে এক মাসেই কয়েকশো কোটি ব্যারেল সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি চালু হওয়া ছাড়া জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
এই সংকট যত দীর্ঘ হবে, ততই বৈশ্বিক অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জ্বালানি খরচ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















