ফেব্রুয়ারিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি স্থির থাকলেও বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভোক্তা দামের বৃদ্ধি প্রত্যাশার মধ্যেই রয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির গতিপথ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ বেড়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি স্থির
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ২.৪ শতাংশ। জানুয়ারিতেও একই হার ছিল, ফলে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা স্থিতিশীল বলেই মনে হচ্ছে।
খাদ্য ও জ্বালানি বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ২.৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের সঙ্গেও এই পরিসংখ্যান প্রায় মিলে গেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান এখন কেবল একটি সূচক মাত্র। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল, এই প্রতিবেদন মূলত সেই অবস্থার প্রতিফলন। যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করলে ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির চিত্র বদলে যেতে পারে।

জ্বালানি বাজারে যুদ্ধের প্রভাব
সংঘাত শুরুর পর থেকেই তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮২ ডলারে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল প্রায় ৬৫ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ০.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে মার্চের পরিসংখ্যানে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও এই পরিস্থিতির পুরো প্রভাব এখনও ভোক্তা দামে প্রতিফলিত হয়নি।
খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম
ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৩.১ শতাংশ, যা গত আগস্টের পর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। একই সময়ে জ্বালানি পণ্যের দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ০.৫ শতাংশ বেড়েছে।

পেট্রোলের দাম বছরে ৫.৬ শতাংশ কমলেও প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে বিদ্যুতের দাম বেশি হচ্ছে।
খাদ্য ও জ্বালানি বাদে অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে ১.৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা এই মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বাসাভাড়া ও আবাসন খরচ
ভোক্তা মূল্যসূচকের বড় অংশজুড়ে থাকা আবাসন ব্যয় ফেব্রুয়ারিতে বছরে ৩ শতাংশ বেড়েছে। গত কয়েক বছরে ভাড়ার বৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এই খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি তথ্য সংগ্রহে আগের কিছু ঘাটতির কারণে প্রকৃত আবাসন ব্যয় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। সেই প্রভাব আগামী মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যেতে পারে।

অর্থনীতির সামনে কঠিন সমীকরণ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থায় থাকে, তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বাড়তে পারে। এতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ কমে যেতে পারে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার মধ্যে নীতিনির্ধারকদের কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদি দামের ধাক্কা দ্রুত কমে গেলে বড় সমস্যা নাও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















