ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমার বিস্ফোরণে সীমাবদ্ধ নেই; এর অর্থনৈতিক ধাক্কা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বিশ্বজুড়ে। প্রতিদিন প্রায় ৮৯১ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক অভিযান চললেও বিশ্লেষকদের মতে যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য আরও অনেক বেশি, যা জ্বালানি বাজার, পরিবহন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিদিন শত কোটি ডলারের সামরিক ব্যয়
বিশ্লেষকদের হিসাব বলছে, চলমান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৮৯১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী জাহাজ, যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান ও স্থলবাহিনী মোতায়েনের কারণে এই ব্যয় দ্রুত বেড়ে চলেছে।
শুধু আকাশপথে সামরিক অভিযান পরিচালনাতেই প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। নৌবাহিনীর অভিযানে দৈনিক ব্যয় প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে স্থল অভিযান যোগ করলে প্রতিদিন আরও প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের একাধিক সামরিক অভিযানের খরচকেও ছাড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে খরচ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে
বিশেষজ্ঞদের মতে যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং কতটা বিস্তৃত হবে, তার ওপর নির্ভর করছে মোট ব্যয়ের পরিমাণ। হিসাব অনুযায়ী, মাত্র দুই মাস যুদ্ধ চললে ব্যয় হতে পারে ৪০ বিলিয়ন থেকে ৯৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। অতীতের উদাহরণ দেখিয়ে তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ইরাক যুদ্ধের মোট খরচ শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
তেলের বাজারে বড় ধাক্কা
যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দেখা যাচ্ছে জ্বালানি বাজারে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে প্রায় ১২০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমে প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে।
এর বড় কারণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উদ্বেগ। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এখানে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি সরবরাহে গুরুতর সংকট তৈরি হতে পারে।

বিমান ভ্রমণে বেড়েছে জ্বালানি ব্যয়
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাতেও। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জেট জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে প্রায় ১৭৩.৯১ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছেছে। বছরের শুরুতে যা ছিল এর প্রায় অর্ধেক।
ফলে অনেক বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আবার কিছু সংস্থা ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যয় আগেই নির্ধারণ করে ঝুঁকি কমানোর কৌশল গ্রহণ করছে।
সমুদ্রপথে বাণিজ্যে অস্থিরতা
সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনেও তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে অনেক জাহাজ আটকে পড়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ছে।

ইতিমধ্যে একটি মানক বিশ ফুট কনটেইনার পরিবহনের খরচ প্রায় ২০০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক জাহাজ এখন দীর্ঘ পথ ঘুরে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ দিয়ে চলাচল করছে, যা সময় ও জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধের অদৃশ্য অর্থনৈতিক চাপ
বিশ্লেষকদের মতে যুদ্ধের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে দীর্ঘমেয়াদে। জ্বালানির দাম বাড়া, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং ভ্রমণ কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।
ফলে এই সংঘাত শুধু সামরিক শক্তির পরীক্ষা নয়, বরং অর্থনৈতিক সহনশীলতারও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















