প্রাচীন রোমান সমাজে পোশাক, অলংকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেলেও অন্তর্বাস সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। ইতিহাসবিদদের মতে, রোমানদের পোশাক নিয়ে বহু প্রমাণ থাকলেও শরীরের ভেতরের স্তরে কী পরা হতো—সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য খুবই সীমিত।
রোমানদের সামাজিক জীবন, প্রকৌশল দক্ষতা, জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক এবং কঠোর সামাজিক শিষ্টাচারের জন্য তারা বিখ্যাত ছিল। তাই অনেকেই ধরে নেন যে তারা নিশ্চয়ই অন্তর্বাস ব্যবহার করত। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ওপেন ইউনিভার্সিটির রোমান প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের অধ্যাপক উরসুলা রোথে জানান, রোমানদের অন্তর্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
রোমান লেখকেরা পোশাক, চুলের সাজ, গয়না এবং অভিজাত ফ্যাশন নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। কিন্তু অন্তর্বাস নিয়ে প্রায় কিছুই উল্লেখ করেননি। তাছাড়া রোমান যুগের বেশিরভাগ কাপড় বা বস্ত্র ছিল জৈব উপাদানের তৈরি, যা সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে খুব কম নমুনাই আজ পর্যন্ত টিকে আছে। যে অল্প কিছু পোশাক বা ছবি পাওয়া গেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যাও অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।
রোথে বলেন, এই সীমিত সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে শুধু পোশাক সম্পর্কে নয়, বরং রোমান সমাজে শরীর, সৌন্দর্য, শালীনতা এবং সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে তাদের ধারণাও বোঝা যায়।
রোমান নারীদের ‘স্ট্রোফিয়াম’
তবে একটি বিষয়ে ইতিহাসবিদরা তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত। রোমান নারীরা ‘স্ট্রোফিয়াম’ নামে এক ধরনের কাপড়ের ব্যান্ড ব্যবহার করত, যা বুকের চারপাশে জড়িয়ে রাখা হতো। এটি অনেকটা আধুনিক ব্রার মতো সহায়তা দিত।
এই পোশাকটি রোমান সমাজের সৌন্দর্যবোধ সম্পর্কেও ধারণা দেয়। রোথের মতে, বড় আকারের স্তনকে তখন অনেক সময় অমার্জিত বা অশোভন হিসেবে দেখা হতো। সমাজের উচ্চবিত্ত নারীরা সাধারণত নিজেদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতেন না; সেই কাজ করতেন দাসী বা ভাড়াটে দুধমা।
ফলে যাদের বুকের আকার বড় মনে হতো, তাদেরকে কখনো কখনো নিম্ন সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হতো। তাই বুক শক্ত করে বেঁধে রাখা স্ট্রোফিয়াম পরা অনেক সময় ছিল সামাজিক পরিশীলন এবং মর্যাদার প্রতীক। এটি কেবল অন্তর্বাসই নয়, বরং সমাজে অবস্থান বোঝানোর একটি সাংকেতিক উপাদান হিসেবেও কাজ করত।
সিসিলির ‘বিকিনি গার্ল’
রোমান নারীদের অন্তর্বাসের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ইতালির সিসিলির ভিলা রোমানা দেল কাসালের বিখ্যাত মোজাইক চিত্র। সেখানে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণী দুই টুকরো পোশাক পরে খেলাধুলা বা শরীরচর্চা করছে। এই পোশাক দেখতে অনেকটা আধুনিক বিকিনির মতো।
তবে এই ছবি থেকে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন ইতিহাসবিদরা। কারণ এসব মোজাইক তৈরি হয়েছিল রোমান সাম্রাজ্যের পরবর্তী সময়ে, যা প্রাথমিক সাম্রাজ্যিক যুগ থেকে অনেকটা ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি।
রোথের মতে, এই পোশাকগুলো সাধারণ অন্তর্বাস ছিল কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এগুলো হয়তো কেবল শরীরচর্চার সময় ব্যবহার করা হতো, যখন নারীরা অন্য পোশাক খুলে ফেলত।

পুরুষদের অন্তর্বাসের প্রমাণ
পুরুষদের ক্ষেত্রে অন্তর্বাস সম্পর্কে প্রমাণ আরও কম। কিছু চিত্রে শ্রমিক, ক্রীড়াবিদ বা দাসদের কোমরে কাপড় জড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। ইতিহাসবিদদের ধারণা, এটি এক ধরনের লয়েনক্লথ বা কোমরবন্ধ কাপড় হতে পারে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই কাপড় কি নিয়মিত টিউনিকের নিচে পরা হতো? কিছু রোমান সাহিত্যিক বর্ণনায় দেখা যায়, কেউ পড়ে গেলে তার শরীর অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ হয়ে যেত। এতে বোঝা যায়, অনেক সময় হয়তো কোনো অন্তর্বাসই পরা থাকত না। তবে এটিও নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
রোমান সমাজে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা
রোমান সমাজে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ধারণা আজকের মতো ছিল না। তারা একসঙ্গে স্নান করত, খোলা শৌচাগার ব্যবহার করত এবং অনেক সময় একসঙ্গে ঘুমাত। তাছাড়া দাসরা প্রায়ই তাদের মালিকদের পোশাক ছাড়া অবস্থায় দেখত।
এই কারণে শরীর ঢেকে রাখাকে সবসময় গোপনীয়তার অংশ হিসেবে দেখা হতো না। অনেক গবেষকের মতে, অন্তর্বাস রোমানদের কাছে আজকের সমাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
তাহলে কি রোমানরা প্রতিদিন অন্তর্বাস পরত?
এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। উরসুলা রোথের মতে, কিছু মানুষ হয়তো টিউনিকের নিচে অতিরিক্ত কাপড় পরত, আবার অনেকেই হয়তো কিছুই পরত না।
তবে এই বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। আধুনিক সমাজে অন্তর্বাসকে আমরা শালীনতা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু রোমান সমাজে এই ধারণা ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাই তাদের পোশাকের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















