মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন দেশ জরুরি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। কোথাও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, কোথাও রেশনিং চালু করা হচ্ছে, আবার কোথাও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কর্মসূচি পরিবর্তন করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এশিয়ার অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ এই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তেলের দাম হঠাৎ করে দ্রুত বেড়ে গেছে। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম একশ ডলারেরও বেশি ছুঁয়ে যায়। ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে শুরু করেছে।

এশিয়ার অনেক দেশ তাদের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এই জ্বালানি সাধারণত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়, যার বড় অংশের গন্তব্য এশিয়া।
বর্তমান সংঘাতের কারণে এই সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির দ্রুত বিকল্প খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।
জ্বালানির দাম বাড়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্যদ্রব্যের দাম পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের জরুরি পদক্ষেপ
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে। কিছু দেশ সরাসরি জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে, আবার কেউ মজুত তেল ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সরকার বাজারে অতিরিক্ত মজুত করা, কারসাজি কিংবা দাম বাড়ানোর চেষ্টা ঠেকাতে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে।
জাপান ও চীনও প্রয়োজনে তাদের কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহার করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই মজুত ব্যবহার করা সব সময় সহজ নয়, কারণ সংরক্ষিত জ্বালানি দ্রুত বাজারে সরবরাহ করা একটি বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।
এদিকে তাইওয়ান দ্রুত নতুন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশটির সরকার অতিরিক্ত গ্যাসবাহী জাহাজের চুক্তি করে এপ্রিল পর্যন্ত সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা নিয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর ব্যবস্থা
কিছু দেশ সরাসরি জ্বালানি ব্যবহার কমানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ফিলিপাইনে কয়েকটি প্রাদেশিক সরকার সপ্তাহে চার দিন কাজের ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়।
সরকারের বক্তব্য, চলমান যুদ্ধ তাদের তৈরি করা নয়, কিন্তু এর অর্থনৈতিক চাপ তাদের বহন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নতুন সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে তা দ্রুতই অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষের জীবনে বাড়ছে চাপ
জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে শুরু করেছে। অনেক দেশে মানুষ আগেভাগেই জ্বালানি কিনে মজুত করার চেষ্টা করছে। ফলে অনেক জায়গায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
জেলেরা সমুদ্রে যাওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন, কারণ জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ট্রাকচালকেরাও নিয়মিত পণ্য পরিবহন চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ না হয়, তবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এই বিঘ্ন কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আর সেই সময়ে এশিয়ার অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা সামলাতে হতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















