বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দেশটি এখনও তার মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এই বাস্তবতায় ইরানকে ঘিরে জাপানের দীর্ঘদিনের জ্বালানি কূটনীতি আবার আলোচনায় এসেছে, যা বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রভাবের মধ্যে আটকে আছে।
ইরানের সঙ্গে জাপানের ঐতিহাসিক জ্বালানি সম্পর্ক
জাপানের সঙ্গে ইরানের জ্বালানি সম্পর্কের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-পরবর্তী দখলদারিত্ব শেষ হওয়ার এক বছর পর জাপানি তেল কোম্পানি ইদেমিৎসু কোসান যুক্তরাজ্যের নৌ অবরোধ এড়িয়ে ইরান থেকে তেল আমদানি করে।
এই ঘটনাটি “নিস্সো মারু ঘটনা” নামে পরিচিত। তখন ইরান অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির সম্পদ জাতীয়করণ করায় যুক্তরাজ্য অবরোধ আরোপ করেছিল। জাপানের সেই উদ্যোগের মাধ্যমে পশ্চিমা বড় কোম্পানির মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি তেল উৎপাদনকারী দেশ থেকে তেল আমদানির পথ তৈরি হয়।

ইরান বিপ্লবের পরও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পরও জাপান ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের মধ্যে ইরান জাপানের মোট তেল আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করত।
সে সময় জাপানের জন্য তেল সরবরাহে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর তৃতীয় স্থানে ছিল ইরান।
আজাদেগান তেলক্ষেত্রের বড় সম্ভাবনা
২০০৪ সালে দীর্ঘ আলোচনা শেষে জাপানের তেল কোম্পানি ইনপেক্স ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে আবিষ্কৃত আজাদেগান তেলক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব অর্জন করে।
প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল এই ক্ষেত্র থেকে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় তেলক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয় এবং জাপানের মোট তেল আমদানির প্রায় ৬ শতাংশ সরবরাহ করতে পারত।

মার্কিন চাপ ও প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানো
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এর ফলে ২০০৬ সালে জাপান আজাদেগান প্রকল্পে তাদের অংশীদারিত্ব কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং ২০১০ সালে সম্পূর্ণভাবে সরে দাঁড়ায়। এতে জাপানের নিজস্বভাবে উন্নয়ন করা তেল সরবরাহের একটি বড় সম্ভাবনা হারিয়ে যায়।
নিষেধাজ্ঞা ও ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরে এসে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর প্রভাব পড়ে জাপানের ওপরও।
২০১৯ সালের মে মাসে জাপানকে ইরান থেকে সব ধরনের অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করতে হয়। ফলে ইরান জাপানের জ্বালানি সরবরাহ তালিকা থেকে কার্যত বাদ পড়ে যায়।
শেল বিপ্লব ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান
শেল বিপ্লবের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভূগর্ভের শক্ত শিলা স্তর থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনে সক্ষম হয়। এতে দেশটির জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমে যায়।
২০১৫ সালে প্রায় ৪০ বছর ধরে চালু থাকা দেশীয় অপরিশোধিত তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত একটি বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।
বর্তমানে জাপানের তেল আমদানির উৎসগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পঞ্চম স্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের পর এর অবস্থান, যদিও মোট আমদানির মাত্র ৩.৮ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

ট্রাম্পের জ্বালানি আধিপত্য কৌশল
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর কৌশলের কথা বলে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিক্রির সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
জাপানকে বেশি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার জন্য চাপ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র উন্নয়নে সহযোগিতার আহ্বানও আসতে পারে।
এ ক্ষেত্রে টোকিওর প্রস্তাবিত ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও ঋণ কর্মসূচিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যা শুল্ক কমানোর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত।

ভেনেজুয়েলার তেলের বিষয়টিও সামনে
জানুয়ারিতে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহের ওপর কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেড়েছে। ফলে সেই তেলের বাজার নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
জাপানের শোধনাগারের সীমাবদ্ধতা
জাপানে সর্বশেষ তেল শোধনাগার নির্মিত হয় ১৯৭৫ সালে আইচি প্রদেশে। দেশের অধিকাংশ শোধনাগার মধ্যপ্রাচ্যের মাঝারি মানের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্য তৈরি।
সে সময় জাপানের মোট তেল আমদানির ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের হালকা তেল বা ভেনেজুয়েলার ভারী তেল কার্যকরভাবে পরিশোধন করতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের বিনিয়োগ একদিকে ব্যয় বাড়াবে, অন্যদিকে কার্বন নির্গমন কমানোর বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।

জ্বালানি কূটনীতির কঠিন সমীকরণ
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেশটি এখনও তার অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।
এই নির্ভরতা কমানো জাপানের জন্য পুরোনো হলেও এখনও গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনিশ্চিত নীতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যাচ্ছেন। সেখানে জ্বালানি কূটনীতির এই জটিল সমীকরণই তাঁর সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















