ইয়াঙ্গুন — মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের একটি বড় শপিং মলের সুপারমার্কেটে ঢুকলে প্রথমে মনে হবে সবকিছু স্বাভাবিক। তাকগুলোতে পণ্য সাজানো, দোকানগুলোও যেন ভরপুর। কিন্তু একটু ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়, এই প্রাচুর্যের দৃশ্য আসলে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। একই ধরনের পণ্য তাকের অনেক জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে, যাতে দোকান ভরা দেখায়।
বাস্তবে দোকানগুলোর পণ্যের ধরন বদলে গেছে। আগে যেখানে নানা দেশের ব্র্যান্ড দেখা যেত, এখন সেখানে প্রায় সবই দেশীয় পণ্য। প্রতিবেশী থাইল্যান্ড থেকে আসা খাদ্যপণ্য কিংবা চীনে তৈরি বিভিন্ন পণ্য প্রায় উধাও।
আমদানিকৃত পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, আগে সহজলভ্য একটি পণ্য টাবাসকো সসের দাম এখন প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে। কারণ এটি আর সরকারি অনুমোদিত পথে পাওয়া যায় না। ফলে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পথে দেশে আনতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, আগে যেসব জিনিস সাধারণ পণ্য ছিল, এখন সেগুলো বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে। এখন কেবল ধনী ক্রেতারাই সেগুলো কিনতে পারছেন।
শুধু সুপারমার্কেট নয়, দেশজুড়ে ফার্মেসি, পোষা প্রাণীর সামগ্রীর দোকান এবং পোশাকের দোকানেও বিদেশি পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে আনুষ্ঠানিক আমদানি অনুমতিপত্র প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান।
ইয়াঙ্গুনের একটি সৌন্দর্য পণ্যের দোকান মালিক জানান, তাদের দোকানে যে অল্প কিছু বিদেশি পণ্য এসেছে, সেগুলো থাইল্যান্ড থেকে অননুমোদিত বিমানপথে আনা হয়েছে।

আমদানিকারকদের জন্য কঠিন সময়
মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানিকারকরা এখনও তুলনামূলক সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে থাকলেও আমদানিকারকদের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। অনেকের মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় সরকার মূলধন বিদেশে চলে যাওয়া ঠেকাতে আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের আগে মিয়ানমারে তুলনামূলক উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নীতি চালু ছিল। তখন বিদেশি মুদ্রা পাওয়া এবং আমদানি লাইসেন্স নেওয়া বেশ সহজ ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। সরকার ‘নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য’ নীতি চালু করে। এতে ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানির আগে রপ্তানি আয়ের প্রমাণ দেখাতে বাধ্য করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সমুদ্রপথে আমদানি লাইসেন্সের বেশিরভাগ আবেদন বাতিল করা শুরু হয়। একই সঙ্গে অবৈধ বাণিজ্য দমন কমিটি গঠন করে গুদামঘরে অভিযান চালানো এবং অননুমোদিত পণ্য জব্দ করা শুরু হয়।

চোরাচালান দমনে আরও কঠোর অভিযান
২০২৪ সালের শেষ দিকে জান্তা সরকারের উপপ্রধান ও অবৈধ বাণিজ্য দমন কমিটির চেয়ারম্যান ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইন অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।
এক বৈঠকে তিনি দাবি করেন, অবৈধ বাণিজ্য থেকে পাওয়া অর্থ দেশের সীমান্ত এলাকায় সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থের উৎস হয়ে উঠছে।
এরপর গত বছরের আগস্ট থেকে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। সেনা কর্মকর্তারা সৈন্য ও কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেন। ফলে আগে যেসব অনানুষ্ঠানিক পথে পণ্য আনা সম্ভব ছিল, সেগুলোও অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ীদের ঝুঁকিপূর্ণ পথ
এখন অনেক ব্যবসায়ী ছোট যানবাহনে করে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে পণ্য আনার চেষ্টা করছেন, যাতে চেকপোস্ট এড়িয়ে যাওয়া যায়। তবে এই পথ খুবই অনিশ্চিত।
কিছু পণ্য পৌঁছালেও অনেক যানবাহন ধরা পড়ছে এবং পণ্য জব্দ করা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।
পণ্য ইয়াঙ্গুনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পরিবহন খরচ কখনো কখনো মূল দামের প্রায় পাঁচ গুণ হয়ে যাচ্ছে।

নতুন নিয়মে আরও চাপ
চাপ আরও বাড়িয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন বিধিনিষেধ। ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী আমদানি লাইসেন্সের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮০ দিন। এছাড়া প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠান মাসে মাত্র একটি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে।
সরকার বলছে, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এতে অবৈধ বাণিজ্য আরও বাড়বে।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কর পণ্যের মূল দামের তিন গুণ পর্যন্ত ধরা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ছে।
রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল আমদানি
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব রপ্তানি আয় না থাকলে সরাসরি আমদানি লাইসেন্সের আবেদন করতে পারে না। তাই অনেক ব্যবসায়ী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে তাদের আয়ের ভিত্তিতে লাইসেন্স নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার একটি আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে ডলার কিনতে ক্রেতাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। সাধারণত প্রতি ডলারে প্রায় ২০০ কিয়াত অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে।
সংকটে ব্যবসায়ীরা
কমপক্ষে দশজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এখন খুব সীমিত সংখ্যায় আমদানি লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থলসীমান্ত বাণিজ্যের অনুমতিও কমে গেছে।
একজন বড় খাদ্য উপকরণ সরবরাহকারী বলেন, অনেক পণ্য ইতিমধ্যেই বিদেশে কেনা হয়ে আছে এবং সেগুলো গুদামে পড়ে আছে। কিন্তু লাইসেন্স না পাওয়া এবং সীমান্ত দিয়ে পণ্য আনতে না পারার কারণে ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন।
তিনি জানান, এখন প্রায়ই পণ্যবাহী যানবাহন আটক করা হচ্ছে এবং মালামাল জব্দ করা হচ্ছে। জব্দ হওয়া পণ্য ফেরত পাওয়ার ঘটনাও খুব কম।
আরেকজন ইলেকট্রনিক্স পাইকারি বিক্রেতা বলেন, ব্যবসার খরচ, কর্মচারীদের বেতন এবং পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে তাদের ঝুঁকি নিয়েই পণ্য আনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, কেউই অবৈধ পথে ব্যবসা করতে চায় না। যদি বৈধভাবে ব্যবসা করা সম্ভব হতো, তাহলে সবাই সেই পথই বেছে নিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















