ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রপথে থাকা রাশিয়ান তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। বৃহস্পতিবার নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেল এখন বিশ্বের বিভিন্ন ক্রেতার কাছে পাঠানো যাবে। ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানির দ্রুত বাড়তে থাকা দাম নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বিশেষ ছাড় ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল বাজারে প্রবেশ করলে বিশ্ববাজারে কয়েকশ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যোগ হতে পারে। এতে ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি ওঠা তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে।
রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার মার্কিন নীতিতে বড় পরিবর্তন
এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং জি–৭ভুক্ত উন্নত দেশগুলো মস্কোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল রাশিয়ান তেলের ওপর মূল্যসীমা নির্ধারণ এবং তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’—অচিহ্নিত জাহাজের বহর—দমনে কঠোর ব্যবস্থা। এই জাহাজগুলো ব্যবহার করে রপ্তানিকারকেরা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি করছিল।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সংঘাত বাড়তে থাকায় অর্থনৈতিক চাপ কমানোর পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন। গত সপ্তাহেই সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেলের একটি চালান, যা ভারতে পাঠানো হচ্ছিল, সেটিও সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন করপোরেশনের মাধ্যমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক বীমা সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। সাধারণত এই সংস্থাটি বিদেশি কোম্পানি ও প্রকল্পে ঋণ বা বিনিয়োগ দিয়ে থাকে।

রাশিয়া কিছুটা আর্থিক সুবিধা পাবে
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট স্বীকার করেছেন যে এই পদক্ষেপে রাশিয়া কিছু আর্থিক সুবিধা পেতে পারে, তবে তার দাবি এটি খুব সীমিত এবং স্বল্পমেয়াদি হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে বিদ্যমান তেল সরবরাহ বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয় সাময়িক অনুমোদন দিয়েছে, যাতে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল বিভিন্ন দেশ কিনতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই পদক্ষেপটি খুব সীমিত এবং শুধু ইতিমধ্যে পরিবহনে থাকা তেলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এতে রুশ সরকারের উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভ হবে না, কারণ তাদের জ্বালানি আয়ের বড় অংশই তেল উত্তোলনের সময় আরোপিত কর থেকে আসে।
একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরান সংঘাত থেকে রাশিয়া আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে—এটি দুর্ভাগ্যজনক। তবে তার আশা, এই সুবিধা খুব স্বল্প সময়ের জন্যই থাকবে।

ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনা
মার্কিন সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, ট্রাম্পের নিজের তৈরি যুদ্ধ পরিস্থিতির অর্থনৈতিক চাপ কমাতে গিয়েই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়ে গেছে। এখন আমেরিকানদের গাড়িতে জ্বালানি ভরতে ট্রাম্পের দুই মেয়াদের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন
এই সিদ্ধান্ত গত গ্রীষ্মের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারতকে শাস্তি দিতে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করেছিল।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জিও–ইকোনমিক স্টাডিজের মরিস আর. গ্রিনবার্গ সেন্টারের পরিচালক এবং সিনিয়র ফেলো এডওয়ার্ড ফিশম্যান বলেন, এই এক সিদ্ধান্তেই রাশিয়ার ওপর আরোপিত অনেক চাপ কার্যত কমে গেছে।
পণ্যবাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ব্যারেল রাশিয়ান তেল সমুদ্রে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নতুন মতবিরোধের আশঙ্কা
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার মতবিরোধ আরও বাড়াতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে এবং তারা রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে চায়।
ফিশম্যান মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে তেলের দাম কমবে—এমনটা নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেল ভারতে পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার পরও বাজারে দামের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।
তার মতে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ান তেলের দাম বাড়ছিল এবং এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
ফিশম্যান বলেন, এতে রাশিয়ার ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা কার্যত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অ্যালান র্যাপেপোর্ট ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি বিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়, করনীতি, বাণিজ্য এবং রাজস্বসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন।
অ্যালান র্যাপেপোর্ট 


















