যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাড়তে শুরু করেছে গৃহঋণের সুদের হার। কয়েক সপ্তাহ আগেও সুদের হার কমে যাওয়ায় বাড়ি কেনার বাজারে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় সেই আশা আবার ধাক্কা খেয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর্থিক বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে সরকারি বন্ডের আয় বেড়েছে এবং সুদের হার কমানোর সম্ভাবনাও কমে গেছে। এতে করে আবাসন বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
গৃহঋণের সুদ আবার বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছরের স্থির সুদের গৃহঋণের গড় হার বেড়ে ৬.১১ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে গৃহঋণ অর্থায়ন সংস্থা ফ্রেডি ম্যাক। টানা দুই সপ্তাহ ধরে এই হার বাড়ছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সুদের হার কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৬ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল যে দীর্ঘদিন স্থবির থাকা আবাসন বাজার হয়তো আবার সচল হতে শুরু করবে।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং মুদ্রাস্ফীতির নতুন আশঙ্কা দেখা দেয়।
যুদ্ধের প্রভাব আর্থিক বাজারে
সংঘাতের প্রভাবে সরকারি বন্ডের আয় দ্রুত বেড়েছে। ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন বৃহস্পতিবার ৪.২৫ শতাংশে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর আগে এটি ৪ শতাংশেরও নিচে ছিল।
এই ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহঋণ বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। ফলে এর বৃদ্ধি সরাসরি গৃহঋণের সুদের ওপর প্রভাব ফেলে।
এছাড়া বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে যে চলতি বছর সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা আগের তুলনায় কমে গেছে।
বাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠছে
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কিনতে আগেই নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিল ক্রেতারা। বাড়ির দাম অনেক বেশি, পাশাপাশি বাড়ছে বীমা খরচ এবং সম্পত্তি কর।

গত কয়েক বছরে গৃহঋণের সুদ কমে যাওয়াই ছিল কিছুটা স্বস্তির বিষয়। যদিও বর্তমান ৬.১১ শতাংশ হার এখনও ২০২৩ সালের অক্টোবরের ৭.৮ শতাংশের চূড়ার তুলনায় কম। সেই সময় সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
তবে সাম্প্রতিক এই ঊর্ধ্বগতি যদি চলতে থাকে, তাহলে অনেক ক্রেতা বাজার থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারেন বলে সতর্ক করেছেন রিয়েলটর ডটকমের অর্থনৈতিক গবেষণা বিশ্লেষক হান্না জোনস।
তিনি বলেন, সামনে বসন্ত মৌসুম নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য শুল্ক, অর্থনীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের পথ স্পষ্ট নয়।
মহামারির পর থেকেই স্থবির বাজার
কোভিড মহামারির সময় অত্যন্ত কম সুদের হার অনেক মানুষকে বাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করেছিল। এর ফলে বাড়ির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
সেই সময় লক্ষ লক্ষ বাড়ির মালিক ৪ বা ৫ শতাংশের নিচে সুদের হারে গৃহঋণ পুনঃঅর্থায়ন করেছিলেন। ফলে এখন সুদের হার বেশি হওয়ায় তারা পুরোনো বাড়ি বিক্রি করে নতুন ঋণ নিতে অনাগ্রহী।
এর ফলে বাজারে নতুন বাড়ির সরবরাহও কমে গেছে।

আমেরিকানদের অনেকের কাছেই বাড়ি কেনা এখন অধরা
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন বাড়ির মালিক হওয়া এখন তাদের নাগালের বাইরে।
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান রেডফিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় চারজনের একজন বড় ধরনের কেনাকাটা—যেমন বাড়ি কেনা—পিছিয়ে দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিতর্কেও আবাসন সংকট
আবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাড়ির দাম কমানোর জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে ৫০ বছরের গৃহঋণ চালু করা, ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের একক পরিবারের বাড়ি কেনা সীমিত করা এবং ফ্যানি মে ও ফ্রেডি ম্যাককে ২০০ বিলিয়ন ডলারের মর্টগেজ-সমর্থিত বন্ড কেনার নির্দেশ দেওয়া।
তবে এসব পরিকল্পনার বেশিরভাগই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে সিনেট একটি আইন পাস করেছে, যার লক্ষ্য নতুন বাড়ি নির্মাণ বাড়ানো। এই আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো, প্রণোদনা দেওয়া এবং বিদ্যমান আবাসন সংরক্ষণের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
বাজারে চাহিদা এখনও দুর্বল
টিডি ব্যাংকের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ঋণ বিভাগের প্রধান অ্যান্ড্রু ওয়ারেন বলেন, মানুষ যদি হতাশা বা সামর্থ্যের অভাবে বাড়ি কেনা থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং এটি আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত হতে পারে।
আবাসন বিক্রির তথ্যও মিশ্র চিত্র দেখাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যমান বাড়ি বিক্রি জানুয়ারির তুলনায় ১.৭ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরস। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি ১.৪ শতাংশ কম।
বাড়ির দামও খুব বেশি বাড়েনি। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যমান বাড়ির মধ্যম দাম এক শতাংশেরও কম বেড়েছে।
সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ লরেন্স ইউন বলেন, বিক্রি সামান্য বাড়লেও প্রকৃত চাহিদা এখনও মজুরি বৃদ্ধি ও চাকরির উন্নতির তুলনায় কম।
ধনী ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের প্রভাব বাড়ছে
ঋণের খরচ বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের অনেক ক্রেতা বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। ফলে ধনী ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা কোটালিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাড়ি কেনার ৩০.২ শতাংশই করেছেন বিনিয়োগকারীরা। মহামারির শুরুতে তাদের অংশ ছিল এর প্রায় অর্ধেক।
রিয়েলটর ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের হঠাৎ বৃদ্ধি নয়, বরং সাধারণ ক্রেতাদের বাজার থেকে সরে যাওয়াই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
ভূরাজনীতি ও তেলের দাম নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সুদের হার কমানোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লোনডিপোর প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদ জেফ ডারগুরাহিয়ান বলেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তেলের দাম উচ্চ অবস্থায় থাকে, তাহলে ফেডারেল রিজার্ভ খুব সতর্ক অবস্থান নেবে।
তার মতে, সুদের হার কমবে কি না—এ মুহূর্তে বিষয়টি প্রায় সমান সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















