মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ঘিরে ইরান সংকট নতুন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার আতঙ্ক
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১৬টি বেসামরিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তেলবাহী ট্যাংকার, কন্টেইনার জাহাজ এবং পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। কিছু জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকটি জাহাজ গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া যে কোনো জাহাজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এই প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট, যেখানে দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরল গ্যাস পরিবহন হয়।
সংঘাতের পর থেকে শত শত জাহাজ উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরের বাইরে নোঙর করে আটকে আছে। তেল ও গ্যাস পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামও দ্রুত বেড়ে গেছে।

ড্রোন ও বিস্ফোরক নৌকা নতুন হুমকি
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার ধরনেও নতুন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নৌ ড্রোন এবং বিস্ফোরক বোঝাই দ্রুতগামী নৌকা ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ভাসমান মাইন, সমুদ্রতলের মাইন বা জাহাজের গায়ে লাগানো বিস্ফোরক ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি বিপর্যস্ত হতে পারে।
তেহরানে হামলা, বিষাক্ত ধোঁয়ার সতর্কতা
সংঘাতের মধ্যে তেহরানের আশপাশে তেল ডিপো ও শোধনাগারে বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থে ভরা বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষদের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে মিশে বৃষ্টির সঙ্গে ফিরে এলে তা অ্যাসিড বৃষ্টিতে পরিণত হতে পারে, যা ত্বক ও ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ
ইরান সংঘাত ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি বিক্ষোভের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ দেখা গেছে, যেখানে অনেক বিক্ষোভ সহিংস রূপও নিয়েছে। পাকিস্তানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরেও এই সংঘাতের পক্ষে ও বিপক্ষে বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও ইরানের বিরুদ্ধে, আবার কোথাও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছে।
অস্ত্র আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের আধিপত্য
নতুন পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে অস্ত্র আমদানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যায়। গত দশকে এই অঞ্চলের অস্ত্র আমদানি ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে ইতালি ও ফ্রান্স। অন্যদিকে ইরানের আমদানি করা অধিকাংশ অস্ত্র এসেছে রাশিয়া থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল অস্ত্র বাজারই মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের ঝুঁকিতে রেখেছে।
বিশ্ববাজারে ধাক্কা
ইরান সংকটের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বাজারে তীব্র ধাক্কা লাগে। কারণ এই দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং বিমান চলাচল—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















