যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করে জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শত শত ছোট নৌকা নামিয়ে কৌশলগত এই জলপথে নতুন চাপ তৈরি করছে তেহরান। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল যে পথ দিয়ে যায়, সেখানে ইরানের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল, তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হরমুজে ছোট নৌকার কৌশল
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর হাতে শত শত, এমনকি হাজার হাজার ছোট নৌকা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই বাহিনী বড় জাহাজকে ঘিরে চাপ সৃষ্টি বা হয়রানি করার কৌশল হিসেবে এসব নৌকা ব্যবহার করে আসছে। অতীতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজও এই কৌশলের মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বড় যুদ্ধজাহাজের পরিবর্তে এসব ছোট নৌকা ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে ইরান বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

যুদ্ধের পরই প্রণালি বন্ধের ঘোষণা
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করার কিছুক্ষণ পরই তেহরান ঘোষণা দেয়, তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন দেখা দেয়।
এর প্রভাব পড়ে তেলের বাজারেও। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়।
মার্চের শুরুতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বলেন, প্রণালিটি বন্ধ রয়েছে এবং প্রয়োজনে “জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে”।

মাইন বসানোর অভিযোগ
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর চেষ্টা শুরু করেছে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বলেছেন, প্রণালিতে মাইন বসানোর কোনো পদক্ষেপ তাদের নেই।
তবু মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন প্রণালিতে ইরানের প্রতিটি নৌগতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, তেল চলাচল বন্ধ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র “বিশ গুণ বেশি শক্তি দিয়ে” পাল্টা আঘাত হানবে। পরে আরেকটি পোস্টে তিনি বলেন, যদি প্রণালিতে কোনো মাইন বসানো হয়ে থাকে, তবে তা অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ
পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাস বলছে, ১৯৮০-এর দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরে পাতা মাইন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ব্যাপক ক্ষতি করেছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনায়ও সেই আশঙ্কা আবার সামনে এসেছে। বুধবার ওই অঞ্চলে তিনটি জাহাজে প্রক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















