যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই পারস্য উপসাগরে তেলবাহী ট্যাঙ্কার, পণ্যবাহী জাহাজসহ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা দ্রুত বেড়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইতোমধ্যে অন্তত ১৬টি জাহাজ এই সংঘাতে হামলার শিকার হয়েছে। এতে শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার বিস্তার
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আক্রমণের লক্ষ্য ক্রমেই তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। ইরান ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করেছে। বৃহস্পতিবার সমুদ্রে দুটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আগুন জ্বলতে দেখা যায়, যা এই ধারাবাহিক হামলার সাম্প্রতিক উদাহরণ।
অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের জ্বালানি মজুতাগার ও বিভিন্ন শক্তি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরজুড়ে তেল উৎপাদন ও সংরক্ষণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে উত্তেজনা
ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়েও হুমকি দিয়েছে। পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়।
যুদ্ধের মধ্যে এই প্রণালির আশপাশে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বুধবার প্রণালির ভেতরে ও আশপাশে তিনটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। কয়েক ঘণ্টা পর ইরাক উপকূলের কাছে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা হয়। পরিস্থিতির কারণে ইরাক ও ওমান তাদের কয়েকটি তেল টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ও জাহাজ হামলার তথ্য
জাহাজে হামলার ঘটনাগুলো বিভিন্ন কোম্পানির বিবৃতি, সরকারি সংস্থার ঘোষণা, শিপিং শিল্পের তথ্য প্রতিষ্ঠান এবং স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই হামলাগুলোর ফলে অন্তত আটজন নিহত হয়েছে এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্যে একটি কন্টেইনার জাহাজকে সাহায্য করতে আসা একটি টাগবোটও ছিল বলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে।
তেল পরিবহন প্রায় বন্ধের পথে
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০টি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছাত, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ নিশ্চিত করত।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। বর্তমানে দিনে মাত্র এক বা দুটি জাহাজ কোনোভাবে এই পথ পার হতে পারছে।
বিশ্ববাজারে তেলের বড় ধাক্কা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধ বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা তৈরি করেছে।
সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলো জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবুও হামলার সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ কমছে না।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থাকা দেশগুলোর জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্প সরবরাহেও পড়বে এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















