ভারতের বিভিন্ন শহরে রাস্তার ধারের ছোট খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বড় রেস্তোরাঁ পর্যন্ত রান্নার জ্বালানি এলপিজি ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশটির খাদ্য ব্যবসায়। ফলে বহু দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে মেনুর খাবারের সংখ্যা।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব
নয়াদিল্লির ইউসুফ সরাই এলাকায় রাস্তার ধারে একটি খাবারের দোকান চালান দুই বন্ধু। তিন দিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর তারা অবশেষে একটি এলপিজি সিলিন্ডার পেলেও দাম শুনে হতবাক হয়ে যান। আগে যে সিলিন্ডার কিনতেন তার প্রায় আড়াই গুণ বেশি দাম দিতে হয়েছে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলা যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি এসে পড়েছে তাদের ছোট ব্যবসায়।
পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দ্রুত চাপ তৈরি হয়েছে। গুজরাটের কিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন শহরে অনেক রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত মেনুতে খাবার পরিবেশন করছে।
কালোবাজারে বাড়ছে সিলিন্ডারের দাম
রাজধানী দিল্লিতে গৃহস্থালি ব্যবহারের ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ৯১৩ রুপি। আগে ছিল ৮৫৩ রুপি। আর বাণিজ্যিক ব্যবহারের ১৯ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮৪ রুপি।
সরকার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অফিসিয়াল সরবরাহ ব্যবস্থা দিয়ে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কালোবাজারই হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত দামের দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
অনেক ছোট খাবারের দোকান খরচ কমাতে গৃহস্থালি সিলিন্ডার ব্যবহার করে থাকে। যদিও এটি আইনত অনুমোদিত নয়, তবুও কম খরচের কারণে বহু ব্যবসায়ী এ পথেই চলতেন। কিন্তু এখন সেই সিলিন্ডারও স্বাভাবিক দামের তুলনায় শতকরা একশ থেকে দেড়শ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায় বাড়ছে চাপ
খাবারের দোকান মালিকদের মতে, সরকার থেকে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক বড় রেস্তোরাঁ মালিক বলছেন, দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের জন্য নিয়ন্ত্রিত দামের দুই থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত অর্থ দিতে বলা হচ্ছে।
কিছু শহরে পরিস্থিতি আরও কঠিন। বেঙ্গালুরুতে একটি সিলিন্ডারের জন্য আট থেকে নয় হাজার রুপি পর্যন্ত দাম চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক দোকান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে খোলা থাকা দোকানগুলোতে সীমিত কয়েকটি জনপ্রিয় খাবারই পরিবেশন করা হচ্ছে।
বাড়ছে ব্যবসার খরচ
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে প্যাকেজিং খরচও। প্লাস্টিক মোড়কের দাম বাড়ায় কাগজভিত্তিক প্যাকেজিং সামগ্রীর দামও প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে খাবারের দোকানগুলোর দৈনিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
যেখানে আগে একটি বড় দোকানে প্রতিদিন সিলিন্ডারের জন্য ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার রুপি খরচ হতো, এখন সেই ব্যয় প্রায় এক লাখ রুপিতে পৌঁছেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
সীমিত মেনুতে চলছে ক্লাউড কিচেন
অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী অনেক ক্লাউড কিচেনও সংকটে পড়েছে। এলপিজি না পাওয়ায় কিছু রান্নাঘর পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। অন্যগুলো সীমিত মেনুতে খাবার সরবরাহ করছে।
খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে রেস্তোরাঁ শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে এবং রান্নাঘর চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
কমে গেছে খাবারের অর্ডার
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ডেলিভারি কর্মীদের আয়েও। অনেক কর্মী বলছেন, সাম্প্রতিক দিনে একই সময় কাজ করেও আগের তুলনায় বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশ কম আয় হচ্ছে। কারণ অর্ডারের সংখ্যাও কমে গেছে।
এভাবে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি পৌঁছে গেছে ভারতের সাধারণ মানুষের খাবারের টেবিল এবং হাজার হাজার ছোট ব্যবসায়ীর জীবিকায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















