মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব সামাল দিতে জ্বালানি ভর্তুকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়া। শুক্রবার দেশটির সরকার জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল দামে জ্বালানি কিনতে পারেন।
ভর্তুকি ব্যয় চারগুণের বেশি বৃদ্ধি
এর আগে রন৯৫ পেট্রোল—যা দেশটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি—এবং ডিজেলের জন্য সরকার প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত ভর্তুকি দিত। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই ব্যয় চারগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন রিঙ্গিতে পৌঁছেছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই অর্থের মধ্যে প্রায় ২ বিলিয়ন রিঙ্গিত ব্যয় হচ্ছে রন৯৫ পেট্রোলের জন্য এবং ১ দশমিক ২ বিলিয়ন রিঙ্গিত ডিজেলের জন্য।
বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে দ্বিতীয় অর্থমন্ত্রী আমির হামজা আজিজান জানান, জ্বালানির উচ্চমূল্য যতদিন থাকবে ততদিন এই অতিরিক্ত ব্যয় অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, জনগণের জন্য মূল্যস্থিতি বজায় রাখতেই সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারের সাশ্রয়ী পদক্ষেপের পরিকল্পনা
আমির হামজা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন চলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সরকার ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এমন কিছু উদ্যোগ বিবেচনা করছে, যা জনগণের ওপর চাপ কমাবে এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করবে।
তিনি আরও জানান, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সংযম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি সাশ্রয়ের জন্য কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাসা থেকে কাজের সুযোগ বাড়ানো, বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া। এসব পদক্ষেপে মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না করে খরচ কমানো সম্ভব বলে মনে করছে সরকার।
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আশ্বস্ত সরকার
এদিকে সরকার জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সরবরাহ বর্তমানে পর্যাপ্ত রয়েছে। বুধবার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার তেলের মজুত অন্তত মে মাস পর্যন্ত চলার মতো রয়েছে।
উচ্চ তেলের দাম: সুযোগ ও ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের উচ্চমূল্যের প্রভাব মালয়েশিয়ার জন্য একদিকে সুবিধাজনক হলেও অন্যদিকে ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
স্ট্র্যাট৩৬৯ কনসাল্টিংয়ের অর্থনীতিবিদ ডরিস লিউ বলেন, জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে মালয়েশিয়া কিছু সুবিধা পেতে পারে। তেলের উচ্চমূল্যের কারণে রপ্তানি আয় বাড়তে পারে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি পেট্রোনাস থেকে কর ও লভ্যাংশের পরিমাণও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তার মতে, তেলের উচ্চমূল্য থেকে যে অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে তার একটি অংশ সরকার দেশীয় বাজারে ভর্তুকি বজায় রাখতে ব্যবহার করতে পারবে। এতে ভর্তুকির আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকলে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। জ্বালানির দাম বাড়লে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং আমদানি করা কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
এর ফলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা ভোগব্যয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মুদ্রা স্থিতিশীলতা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে
আইপিপি গ্লোবাল ওয়েলথের অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ সেদেক জানতান বলেন, জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ানোর কারণে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হলেও একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। তা হলো মালয়েশিয়ার মুদ্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে এবং ডলারের বিপরীতে এর মান এখনো ৪ রিঙ্গিতের নিচে অবস্থান করছে।
তার মতে, মুদ্রার এই স্থিতিশীলতা আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আংশিকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















