মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হওয়ায় জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান।
ম্যানিলা
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাড়তে থাকায় সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আসিয়ানের অর্থনৈতিক মন্ত্রীরা।
শুক্রবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বৈঠক শেষে ১১ সদস্যের এই আঞ্চলিক জোটের অর্থনৈতিক মন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
![]()
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ, জ্বালানির উৎস ও সরবরাহের পথ বৈচিত্র্যময় করা এবং বিকল্প জ্বালানির উন্নয়ন বাড়ানো জরুরি।
বিশেষ করে জৈব জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতির জন্য আঞ্চলিক জ্বালানি মজুত ও প্রস্তুতি জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও সতর্কতা
মন্ত্রীরা বলেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহে চাপ পড়তে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষভাবে সারসহ কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহ অব্যাহত রাখা দরকার বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক চুক্তিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাজার খোলা রাখা এবং খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খোলা রাখার আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব কমাতে আসিয়ান অঞ্চলের বাজার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রীরা।
বৈঠকের শুরুতে ফিলিপাইনের বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রিস্টিনা রোকে বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন আর দূরের কোনো খবর নয়। ইরানের পরিস্থিতি দেখিয়ে তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিস্থাপকতা এখন আর কেবল লক্ষ্য নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের প্রধান সুরক্ষা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি আলোচনা
একই দিনে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং এর সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে সামরিক হামলা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানানো হয়।
ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া থেরেসা লাজারো জানান, আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলো আরও ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা বাড়াতে এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সম্মত হয়েছে।
তেলের দাম বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের ওপর হামলা এবং পাল্টা হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে আসিয়ান অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের মুদ্রাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কিছু দেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিপাইন সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। থাইল্যান্ড সরকারি কর্মকর্তাদের সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। ভিয়েতনামও বিভিন্ন কোম্পানিকে কর্মীদের দূরবর্তীভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে উৎসাহিত করেছে।
এদিকে থাইল্যান্ড মিয়ানমার ও লাওস ছাড়া অন্য সব দেশে জ্বালানি রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে।
শিল্প খাতে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব শিল্পখাতেও পড়তে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ার কীটনাশক উৎপাদকরা জানিয়েছে, তাদের পণ্যের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অন্যদিকে থাইল্যান্ডের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিয়াম সিমেন্ট গ্রুপ সরবরাহ সংকটের কারণে তাদের একটি রাসায়নিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















