যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের সার কারখানাগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো অচল হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সার উৎপাদন ও সরবরাহে বাধা পড়লে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার ভঙ্গুর কাঠামো বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।
উত্তর গোলার্ধের কৃষকদের জন্য এই যুদ্ধ এসেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। বসন্তকালীন বপন মৌসুম শুরু হওয়ায় সার চাহিদা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সাধারণ ভোক্তাদের কাছে যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিই বেশি দৃশ্যমান হলেও, একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে সারের দাম এবং সংকুচিত হচ্ছে এর কাঁচামালের সরবরাহ।
যুদ্ধ কীভাবে সারের সরবরাহে প্রভাব ফেলছে
আধুনিক সারের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে নাইট্রোজেন মিশিয়ে অ্যামোনিয়া তৈরি করা হয়। এরপর সেই অ্যামোনিয়া থেকে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং ইউরিয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট তৈরি হয়, যেগুলো নাইট্রোজেনভিত্তিক সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কৃষিকাজে ফসফরাস ও পটাশিয়ামভিত্তিক সারও ব্যবহৃত হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় নাইট্রোজেন সার। বিশ্বজুড়ে মোট সার ব্যবহারের প্রায় ৫৯ শতাংশই এই ধরনের সার। গবেষকদের মতে, এসব সার না থাকলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদনই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল মজুত থাকার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল অ্যামোনিয়া উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যদিও বিশ্বে সার উৎপাদনে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও রাশিয়া শীর্ষে রয়েছে, তবু ইরান, সৌদি আরব এবং কাতারও বড় উৎপাদকদের তালিকায় রয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাইট্রোজেন সার হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।
কিন্তু মার্চের শুরু থেকে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৭ মার্চ মাত্র চারটি জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করেছে, যেখানে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৯টি জাহাজ চলাচল করত।
এই পরিস্থিতির ফলে সার আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে না এবং দাম দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯৪ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪৬৪ ডলার।
একই সময়ে সালফারের দামও বেড়েছে, যা ফসলের উৎপাদন বাড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করতে ব্যবহৃত হয়। চীনা বাজারে এর দাম ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রপথে জ্বালানি ও বীমা খরচ বৃদ্ধির চাপ।
উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু সার উৎপাদনই করে না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অ্যামোনিয়া কারখানায় ব্যবহারের জন্য গ্যাসও রপ্তানি করে। কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজার থেকে হঠাৎ করে প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে ভারতের ইউরিয়া উৎপাদনকারীরা ইতোমধ্যে উৎপাদন কমিয়েছে এবং কিছু কারখানা বন্ধের আলোচনাও চলছে।

বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার জন্য কী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে
উৎপাদন খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে ভোক্তার ওপর। কোভিড মহামারির সময় সরবরাহব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর সারমূল্য বৃদ্ধির কারণে ইউরোপে খাদ্যের দাম ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রাশিয়ার গ্যাস ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের তরল গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর ফলে ইউরোপের সার শিল্পও চাপে পড়েছে। গ্যাসের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পোল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত সার কোম্পানি গ্রুপা আজোটি মার্চের শুরুতে নতুন অর্ডার নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরে বাজারদর অনুযায়ী আবার অর্ডার গ্রহণ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র দেশগুলো। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদান, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, সোমালিয়া, কেনিয়া ও মোজাম্বিক এমন কয়েকটি দেশ, যেগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা সারের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
সুদানের ব্যবহৃত সারের প্রায় ৫৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৩৬ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। উন্নয়নশীল দেশের অনেক কৃষকই উৎপাদন খরচ হঠাৎ বেড়ে গেলে তা সামাল দিতে পারেন না। ফলে খাদ্য সংকট দ্রুত দুর্ভিক্ষে রূপ নিতে পারে।

সার সংকট থেকে কারা লাভবান হচ্ছে
তেলের মতো সারের ক্ষেত্রেও উচ্চমূল্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে সেইসব দেশের জন্য, যারা উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে সরবরাহ করতে সক্ষম। এই অবস্থায় রাশিয়া অন্যতম সুবিধাভোগী। রাশিয়া ও বেলারুশ মিলিয়ে বিশ্বে মোট সার রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ায় সার উৎপাদন ৩.৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৬ কোটি ৫৪ লাখ টনে পৌঁছেছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া ও বেলারুশের সারের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, যার লক্ষ্য রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করা।
তবুও ইউরোপীয় বাজার হারিয়ে রাশিয়া তার রপ্তানি ঘুরিয়ে দিয়েছে ব্রিকস দেশগুলোর দিকে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব দেশে রাশিয়ার সার রপ্তানি প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
সস্তা সারের সুবিধা পেয়ে রাশিয়ার কৃষিখাতেও নতুন ধনী শ্রেণির উত্থান ঘটছে। ২০২৬ সালের ধনকুবের তালিকা অনুযায়ী, গত বছরে রাশিয়ায় যে ১৪ জন নতুন ডলার বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে সাতজনই কৃষি ও খাদ্য খাত থেকে সম্পদ অর্জন করেছেন।
এই তালিকায় রয়েছেন বৃহৎ কৃষি প্রতিষ্ঠান আগ্রোকমপ্লেক্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্দর তাকাচেভ এবং রুশ কৃষি কোম্পানি রুসাগ্রোর নিয়ন্ত্রক ভাদিম মোশকোভিচ। পাশাপাশি সার ব্যবসায়ী আন্দ্রেই মেলনিচেঙ্কো ও দিমিত্রি মাজেপিনও ইউরোপীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে তাদের সম্পদ আরও বাড়িয়েছেন।

সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা কী
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিকভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা কম। হোয়াইট হাউসের ধারণা, এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই মাস স্থায়ী হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। কখনও তিনি যুদ্ধকে প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে উল্লেখ করছেন, আবার কখনও হুমকি দিচ্ছেন যে ইরান যদি নৌপথে বাধা সৃষ্টি করে তবে কঠোর সামরিক জবাব দেওয়া হবে।
তবে বাস্তবে পরিস্থিতি জটিল। বীমা কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে বীমা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌপথ কার্যত অচল হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে ইরান যদি অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী দিয়ে জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানোর বিষয়টি আলোচনা করেছে, যদিও এখনো তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এর মধ্যেই মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল, গ্যাস এবং সার আবারও স্বাভাবিকভাবে নৌপথে চলাচল শুরু করবে। তিনি জানান, সম্প্রতি একটি বড় তেলবাহী জাহাজ কোনো সমস্যা ছাড়াই প্রণালী পার হয়েছে। তবে পরে জানা যায়, সেই জাহাজটি ছিল ইরানের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















