মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে যখন ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সামরিক শক্তিতে প্রতিপক্ষের তুলনায় দুর্বল হলেও অর্থনৈতিক আঘাতের মাধ্যমে পরিস্থিতি পাল্টানোর কৌশল নিয়েছে তেহরান। এর ফলে হরমুজ প্রণালী ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
তেলের ধমনীতে ইরানের কৌশল
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে সাধারণত বৈশ্বিক তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর এই পথের জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে গেছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যে সংঘাতে জড়ালে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সীমিত করে দিতে পারে। এখন সেই কৌশল বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এতে শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ছায়াযুদ্ধের নতুন রূপ
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বহুদিন ধরেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে বিভিন্ন ফ্রন্টে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখা। সরাসরি বড় যুদ্ধের পরিবর্তে ছোট ছোট আঘাতের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করাই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝে গেছে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানো কঠিন। তাই তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক চাপের দিকে বিস্তৃত করছে।

পুরোনো যুদ্ধের কৌশলের প্রতিধ্বনি
ইরান আগে এমন কৌশল ব্যবহার করেছে। আশির দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত সংঘাতে উপসাগরের জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল। সেই সময়ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ এখন ইরানের হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক কম খরচের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, যা অনেক বড় এলাকা জুড়ে আঘাত হানতে সক্ষম।
যুদ্ধকে অর্থনৈতিক চাপে রূপ দেওয়ার চেষ্টা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের লক্ষ্য শুধু সামরিক প্রতিরোধ নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। সীমিত সংখ্যক হামলার মাধ্যমেই তারা বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে চাইছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়লে যুদ্ধ থামানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে।
ইরানের সামরিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য এখন টিকে থাকা। একই সঙ্গে তারা এমন বার্তা দিতে চাইছে যে কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

দীর্ঘ সংঘাতের ঝুঁকি
পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সংঘাত শুধু একটি দেশের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর। সেই বাস্তবতাকেই কাজে লাগাতে চাইছে তেহরান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















