মা নিজের চোখে দেখলেন মেয়ের দগ্ধ দেহ। চুল্লির দরজা খুলতেই সামনে পড়ে ছিল অচেনা হয়ে যাওয়া সেই শরীর। মুহূর্তেই বদলে যায় জীবনের সবকিছু। দুই বছর পরও সেই ঘটনার উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন এক ভারতীয় মা।
কানাডার দোকানঘরে ভয়াবহ মৃত্যু
২০২৪ সালে কানাডার হ্যালিফ্যাক্স শহরের একটি বড় দোকানঘরে কর্মরত ছিলেন ১৯ বছর বয়সী গুরসিমরন কৌর। সেই দোকানের শিল্পকারখানার মতো বড় চুল্লির ভেতরে আটকা পড়ে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার সময় একই দোকানে কাজ করছিলেন তার মা মন্দীপ কৌরও। মা–মেয়ে দুজনই ২০২২ সালে ভারত থেকে কানাডায় গিয়েছিলেন নতুন জীবনের আশায়।
দুর্ঘটনার প্রায় দুই বছর পরও মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পারেননি মন্দীপ কৌর। পুলিশের তদন্তে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আবার পরিবারও মনে করে না এটি আত্মহত্যা।
মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে মায়ের আতঙ্ক
২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর কাজের সময় মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মন্দীপ কৌর।
তিনি দোকানের বিভিন্ন কর্মচারীর কাছে মেয়ের খোঁজ জানতে চান। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো কোনো ক্রেতাকে সহায়তা করতে গিয়ে ব্যস্ত রয়েছে গুরসিমরন।
কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে মায়ের উদ্বেগ। এরপর কর্তব্যরত ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি দোকানের ভেতর খোঁজ শুরু করেন।
চুল্লির পাশে অদ্ভুত তরল
খোঁজ করতে করতে মন্দীপ পৌঁছে যান সেই শিল্প চুল্লির কাছে, যেখানে হিমায়িত রুটি তৈরি করা হতো। সেখানে তিনি লক্ষ্য করেন, চুল্লির পেছন দিক থেকে কালচে বাদামি রঙের একটি তরল বের হয়ে আসছে।
অস্বাভাবিক সেই দৃশ্য দেখে তিনি চুল্লির দরজা খুলে ফেলেন।
দরজা খুলতেই সামনে পড়ে মেয়ের দগ্ধ দেহ। শরীর এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে তাকে প্রায় চিনতেই পারেননি মা।
মন্দীপ কৌর জানান, সেই মুহূর্তে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেননি। কয়েক মিনিট মেয়ের পাশে মেঝেতে বসে ছিলেন তিনি। কী ঘটেছে, তা বুঝতেই পারছিলেন না।
জীবনের সব বদলে যাওয়ার মুহূর্ত
মায়ের ভাষায়, কয়েক সেকেন্ডেই তার পুরো জীবন বদলে যায়।
চুল্লি থেকে বের হওয়া কালচে তরলটি যে তার মেয়ের শরীর থেকে বেরিয়েছে, সেটি বুঝতে পেরে আরও ভেঙে পড়েন তিনি।
আজও তাকে তাড়া করে সেই প্রশ্ন—মেয়ে কি তখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিল? কতক্ষণ ধরে সে বাঁচার চেষ্টা করেছিল?
তদন্তে মিলছে না স্পষ্ট উত্তর
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার পেছনে অপরাধমূলক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, যে চুল্লির ভেতরে গুরসিমরনের মৃত্যু হয়, সেটি ভেতর থেকেও খোলা সম্ভব ছিল।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা আইন ভঙ্গের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
তবে পরিবার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি, গুরসিমরন কখনোই নিজের জীবন নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না।
মায়ের অস্বস্তিকর প্রশ্ন
মন্দীপ কৌর বলেন, মেয়ের মৃত্যুর পর তিনি একটি পার্সেল পান, যা গুরসিমরন নিজের জন্য আগেই অর্ডার করেছিলেন।
তার মতে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে না।
দীর্ঘ তদন্তের পরও কর্তৃপক্ষ কী ঘটেছিল তা স্পষ্টভাবে বলতে পারেনি—এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে পরিবারকে।
আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
প্রায় আঠারো মাস ধরে তদন্ত চললেও এখনও ঘটনার কোনো দৃঢ় ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।
এই অবস্থায় দোকান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছেন মন্দীপ কৌর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















