মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও হংকংয়ের জন্য এটি উল্টো নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। শহরটির স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ ও নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে এসে হংকংমুখী হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থ ও ট্রেজারি দপ্তরের প্রধান ক্রিস্টোফার হুই চিং-ইউ।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক তহবিল তাদের বিনিয়োগের গন্তব্য নতুন করে ভাবছে। এই প্রেক্ষাপটে হংকংকে তারা একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে।
ভূরাজনৈতিক সংঘাতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা
ক্রিস্টোফার হুই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে যাওয়ার কথা ছিল এমন অনেক আন্তর্জাতিক তহবিল এখন তাদের বিনিয়োগ বৈচিত্র্যময় করার কথা ভাবছে। চলমান সংঘাত অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে হংকংয়ের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্বচ্ছতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার পর থেকে হংকংয়ের আর্থিক ও আইনগত খাত বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বেশি অনুসন্ধান পাচ্ছে। অনেকেই তাদের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবসা বা পারিবারিক বিনিয়োগ কার্যালয় হংকংয়ে স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইছেন।
জ্বালানির দামে অস্থিরতা, তবু স্থিতিশীল বাজার
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই জ্বালানি বাজারে পড়েছে। ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর কার্যত প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
এই বছরের শুরুতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যেখানে প্রায় ৬০ ডলার ছিল, সেখানে তা বেড়ে ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে। যদিও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আর্থিক বাজারে কিছু ওঠানামা তৈরি করতে পারে, তবুও হংকংয়ের বাজারব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই চলছে বলে জানান হুই।
তার মতে, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বাজারে সঠিক দামের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং লেনদেন ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখা।
পারিবারিক বিনিয়োগ কার্যালয় বাড়াতে উদ্যোগ
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ হংকংয়ে তিন হাজার তিন শতাধিক পারিবারিক বিনিয়োগ কার্যালয় ছিল। গত দুই বছরে নতুন করে ছয় শত আশিটি এমন প্রতিষ্ঠান শহরটিতে এসেছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠান পাঁচ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করে।
সরকার আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে আরও দুই শত বিশটি নতুন পারিবারিক বিনিয়োগ কার্যালয় আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়েছে। এ জন্য মূল্যবান ধাতু ও ডিজিটাল সম্পদের লেনদেনে করছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
হুই বলেন, বিনিয়োগকারীরা হংকংয়ে এসে শুধু ব্যবসার সুযোগই পান না, পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ পরিবেশও পান। এতে শহরটি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
পণ্য বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ার পরিকল্পনা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হংকংয়ের পণ্য বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠার পরিকল্পনাকেও ত্বরান্বিত করতে পারে বলে মনে করেন হুই। বিশেষ করে মূল্যবান ধাতু ও অলোহ ধাতুর বাণিজ্যে শহরটির সম্ভাবনা বাড়ছে।
তিনি বলেন, আগে পণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা মূলত দাম বিবেচনা করতেন। কিন্তু এখন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের উৎপাদন খাত বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় অলোহ ধাতুর চাহিদা বাড়তেই থাকবে, যা হংকংয়ের পণ্যবাজারের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
অর্থনীতির নতুন খাত বিকাশে পরিকল্পনা
এদিকে হংকংয়ের অর্থমন্ত্রী পল চ্যান মো-পো তার সাপ্তাহিক ব্লগে বলেছেন, শহরটি তার বিদ্যমান সুবিধা কাজে লাগিয়ে আরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, “এক দেশ দুই ব্যবস্থা” নীতি, সাধারণ আইনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্ল্যাটফর্ম, দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও মানবসম্পদের সমন্বয় হংকংকে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।
এ ছাড়া মেধাস্বত্ব, পরীক্ষণ ও মাননিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি সেবাখাতের উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















