নিউইয়র্কের খ্যাতনামা কার্নেগি হলে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে আরও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছেন আগ্রায় জন্ম নেওয়া নিউইয়র্কভিত্তিক দাতা ও সংগীতশিল্পী ইলা পালিওয়াল। তিনি এবং তার স্বামী ব্যবসায়ী দিনেশ পালিওয়াল মিলে ১ কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছেন, যার মাধ্যমে কার্নেগি হলে ভারতীয় সংগীতের একটি বার্ষিক উৎসব শুরু হবে। এই উৎসবের সূচনা হওয়ার কথা ২০২৭ সালের মে মাসে।
কার্নেগি হলে ভারতীয় সংগীতের স্থায়ী জায়গা
ইলা পালিওয়াল জানান, তিনি এবং তার স্বামী প্রায়ই কার্নেগি হলে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান শুনতে যেতেন। কিন্তু প্রতিবারই মনে হতো এই সংগীতের উপস্থিতি সেখানে খুবই সীমিত।
তার কথায়, সাধারণত কয়েক দিনের জন্য অনুষ্ঠান হতো, তারপর আবার দীর্ঘ সময় কোনো আয়োজন থাকত না। এমনকি বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ভারতীয় সংগীতকে তাদের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ করে তুলছিল না।
তিনি বলেন, ভারত একটি বিশাল দেশ, যেখানে অসংখ্য প্রতিভাবান শিল্পী রয়েছে। তাই এই সংগীতের জন্য একটি স্থায়ী মঞ্চ থাকা জরুরি, যাতে এটি কেবল একবারের চমকপ্রদ অনুষ্ঠান হয়ে না থেকে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে পরিণত হয়।
এই ভাবনা থেকেই ইলা ও দিনেশ পালিওয়াল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কার্নেগি হলকে ১ কোটি ডলারের তহবিল দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের দুই থেকে তিন বছর সময় লেগেছে।
/local-samosal/media/media_files/2026/02/23/chosen-2026-02-23-17-38-19.png)
দশ বছরব্যাপী উৎসবের পরিকল্পনা
নতুন এই উৎসবে প্রতি বছর হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটক—দুই ধারার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীদের অংশগ্রহণ থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎসবটি অন্তত এক দশক ধরে চলবে।
এছাড়া নির্বাচিত শিল্পীদের ‘কার্নেগি হল ফেলো’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হবে এবং তাদের পরিবেশনা হলের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবেও উপস্থাপিত হবে।
ইলা পালিওয়াল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত। তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘প্রথম’-এর আমেরিকান শাখার বোর্ড সদস্য। কার্নেগি হলের বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার পরই তিনি ভারতীয় সংগীত উৎসব আয়োজনের এই শর্তটি দেন।
কেন বেছে নেওয়া হলো কার্নেগি হল
এই অনুদান দেওয়ার আগে পালিওয়াল দম্পতি নিউইয়র্কের লিঙ্কন সেন্টারেও অর্থ দেওয়ার বিষয়টি ভেবেছিলেন। সেখানে নিউইয়র্ক ফিলহারমোনিক ও জুলিয়ার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগীত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ইলা কার্নেগি হলকেই বেছে নেন। কারণ এই স্থানের দীর্ঘদিনের শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য এবং সেখানে পরিবেশিত শিল্পের মান। তার মতে, কার্নেগি হলে যেকোনো পরিবেশনা অত্যন্ত উৎকর্ষতার সঙ্গে উপস্থাপিত হয় এবং এখানকার শ্রোতাদেরও সংগীত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ কার্নেগি হল
শিল্পপতি অ্যান্ড্রু কার্নেগির অর্থায়নে নির্মিত কার্নেগি হলের উদ্বোধন হয় ১৮৯১ সালে। সোনালি ও ক্রিম রঙের ধাপবিন্যাস করা স্থাপত্য এবং বিখ্যাত বাঁকানো বারান্দা এই হলকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তবে এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য নিখুঁত ধ্বনিবিজ্ঞান। উদ্বোধনী কনসার্ট পরিচালনা করেছিলেন রোমান্টিক যুগের বিখ্যাত সুরকার চাইকোভস্কি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে পরিবেশনা করেছেন জ্যাজ কিংবদন্তি ডিউক এলিংটন ও লুই আর্মস্ট্রং, জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটলস এবং সংগীতশিল্পী বব ডিলানসহ অনেক বিশ্বখ্যাত শিল্পী।
ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে পণ্ডিত রবিশঙ্কর এখানে সর্বাধিক ২৯ বার পরিবেশন করেছেন। তার পরেই রয়েছেন উস্তাদ জাকির হুসেন, যিনি ২২ বার মঞ্চে উঠেছেন। এছাড়া উস্তাদ বিলায়েত খান, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, পণ্ডিত জসরাজ, শাক্তি ব্যান্ড, অনুষ্কা শঙ্কর, বাঁশিবাদক রাকেশ চৌরাসিয়া, পিয়ানোবাদক চারু সুরি এবং কণ্ঠশিল্পী কৌশিকী চক্রবর্তীও এখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন।
শিল্পী নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ইলা পালিওয়াল জানান, কার্নেগি হলের দলের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি উৎসবের শিল্পী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবেন। তবে নির্বাচন হবে কেবল প্রতিভার ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে নয়।
তিনি বলেন, দর্শক টানতে অবশ্যই কিছু জনপ্রিয় নামও প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনায় সংগীত পরিচালক এ আর রহমান এবং কণ্ঠশিল্পী শ্রেয়া ঘোষালকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
উৎসবটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রতিভাবান শিল্পীদেরও মঞ্চ দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে, যাদের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বড় প্ল্যাটফর্মে ওঠার সুযোগ কম।
এছাড়া কার্নেগি হলের ডিজিটাল শিক্ষা প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন মাস্টারক্লাস আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংগীতশিল্পী হিসেবেও সক্রিয় ইলা
ইলা পালিওয়াল নিজেও একজন সংগীতশিল্পী। ২০১৫ সালে কার্নেগি হলেই তিনি তার সংগীত অ্যালবাম ‘নবরত্ন’ প্রকাশ করেন।
নয়টি গানের এই অ্যালবামটি প্রযোজনা করেছিলেন এ আর রহমান এবং পারকাশন শিল্পী রঞ্জিত বরোট। এতে পঙ্গল, ঈদ, দীপাবলি, বৈশাখী ও বড়দিনসহ বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে গান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আগ্রা থেকে আন্তর্জাতিক সংগীতযাত্রা
ইলা আগ্রায় সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। তার বাবা ছিলেন কবি এবং মা ইংরেজি ও সংস্কৃতের অধ্যাপক। তার মা সেতারও বাজাতেন এবং লতা মঙ্গেশকর ও এম এস সুব্বুলক্ষ্মীর বড় ভক্ত ছিলেন।
শৈশব থেকেই ইলা সংগীতের চর্চা শুরু করেন। তিনি গ্বালিয়র ঘরানার পণ্ডিত সীতারাম ব্যাভহারের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেছেন।
পরবর্তীতে তিনি আইআইটি রুরকির প্রকৌশলী দিনেশ পালিওয়ালকে বিয়ে করেন। এরপর তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করেন, পরে চীনে কিছু সময় কাটিয়ে গত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
এই সময়েও তিনি সংগীতের শিক্ষা চালিয়ে যান। পদ্মা তলওয়ালকর, আরতি অঙ্কলেকার এবং রঘুনন্দন পনশিকরের কাছে তালিম নেন, যারা সবাই কিংবদন্তি শিল্পী কিশোরী আমোনকরের শিষ্য।
২০১৩ সালে তিনি কিশোরী আমোনকরের স্মরণে ‘গানসরস্বতী মহোৎসব’ শুরু করেন। বর্তমানে এই উৎসবটি ত্রয়োদশ বছরে পা দিয়েছে।
ভবিষ্যতে ভারতেও সহযোগিতার ভাবনা
ভারতে শিল্পীরা এখনও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না—এ বিষয়টি নিয়েও ভাবছেন ইলা পালিওয়াল।
তিনি জানান, কার্নেগি হলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের যুব অর্কেস্ট্রাকে ভারতে নিয়ে আসতে আগ্রহী। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে দুই দেশের শিল্পীদের মধ্যে বিনিময়মূলক কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় সংগীতের আরও বিস্তার ঘটবে বলে আশা করছেন তিনি।
লেখক: সারাক্ষণ রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















