বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতি আসলে কিসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ফাইবার-অপটিক কেবল—যা এখন ক্রমশ বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রতলের কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা, ১৯৮২ সালের সমুদ্র আইন সম্পর্কিত জাতিসংঘ সনদ (ইউএনক্লস)-এর আইনি সীমাবদ্ধতা এবং বড় শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা—এই তিনটির মিলিত প্রভাব সমুদ্রতলের এই অবকাঠামোকে কেবল প্রযুক্তিগত বা বাণিজ্যিক বিষয় থেকে তুলে এনে নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করেছে। একে অনেকেই এখন “এই শতাব্দীর গোপন যুদ্ধক্ষেত্র” বলে অভিহিত করছেন। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার নতুন গতি তৈরি করেছে।
সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবল বিশ্বজুড়ে আন্তমহাদেশীয় ডেটা আদান-প্রদানের প্রায় ৯৯ শতাংশ বহন করে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ইউরোপ ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বারবার বিঘ্নের মুখে পড়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য এই অভিন্ন দুর্বলতা আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার দ্বিমুখী রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব—কোনো এক শক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কাল্লাস এবং সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চ্যান চুন সিং উভয়েই বলেছেন, সমুদ্রতলের কেবল সুরক্ষিত রাখতে হলে দূরবর্তী দেশগুলোকেও একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ এ ধরনের অবকাঠামোর কোনো এক অংশে আঘাত মানেই পুরো নেটওয়ার্কের ওপর আঘাত।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা ও কেবল নেটওয়ার্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে সমুদ্রতলের কেবল ব্যবস্থাকে নিরাপত্তার বিষয় করে তুলছে এবং এটিকে বিভক্তও করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কেবল প্রকল্পে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং “বিদেশি প্রতিপক্ষ” হিসেবে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত করেছে।
অন্যদিকে চীন তাদের টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে কম খরচে সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা নির্মাণে সহায়তা করছে। এমনকি তারা এমন উন্নত প্রযুক্তির কেবল কাটার যন্ত্রও তৈরি করেছে যা সমুদ্রতলের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যাহত করতে সক্ষম।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হতে পারে। যদি কেবল বাজারটি যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ এবং চীন-ঘনিষ্ঠ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তবে সরবরাহকারীর সংখ্যা কমে যেতে পারে, অবকাঠামোর খরচ বাড়তে পারে এবং দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত হতে পারে।

অপর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক আইন
সমুদ্রতলের কেবল নিয়ে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো—বিশেষ করে ইউএনক্লস—অনেকের মতে যথেষ্ট নয়। এই সনদ অনুযায়ী আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার বাইরে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রধান দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট জাহাজের পতাকাবাহী রাষ্ট্রের ওপর। কিন্তু অধিকাংশ দেশ এখনো এমন আইন করেনি যাতে তাদের পতাকাবাহী জাহাজ বিদেশি এলাকায় ক্ষতি করলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়।
যদি কোনো জাহাজ অন্য দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের আইনি প্রতিকার সীমিত থাকে। তাছাড়া ইচ্ছাকৃত নাশকতা ও দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হওয়ায় জবাবদিহি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউএনক্লসের অধীনে আন্তর্জাতিক তদন্ত ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।
আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
সমুদ্রতলের কেবল নিয়ে আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুই পক্ষের হুমকি মূল্যায়ন ভিন্ন হওয়ায় তা একে অপরকে পরিপূরক করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাবসি কেবলকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে, যা হাইব্রিড আক্রমণ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই তারা বাধ্যতামূলক নিয়ম, বিশেষ তহবিল এবং কেবল নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে আসিয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি কেন্দ্রিত অপারেশনাল ঝুঁকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বড় শক্তিগুলোর চাপের ওপর—যা সদস্য দেশগুলোর অবকাঠামোগত অংশীদার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। তাদের পদক্ষেপ মূলত স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো, মেরামত নির্দেশিকা তৈরি এবং ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সমন্বয় বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ; এখনো যৌথ অপারেশনাল ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এই ভিন্ন অবস্থানই সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আসিয়ান ইউরোপের নিয়ন্ত্রক ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বেছে নেওয়া সুবিধা নিতে পারে, আবার নিজের কৌশলগত স্বাধীনতাও বজায় রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট অঞ্চলে তাদের কেবল নিরাপত্তা উদ্যোগ সম্প্রসারণের সুযোগ দেয়, যেখানে তারা এতদিন সীমিতভাবে জড়িত ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি ও উদ্যোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে ২০২২ সালে গৃহীত এনআইএস২ নির্দেশনা এবং ক্রিটিক্যাল এন্টিটিজ রেজিলিয়েন্স নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করার একটি অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরি করেছে, যার মধ্যে সমুদ্রতলের কেবলও অন্তর্ভুক্ত।
২০২৫ সালের কেবল নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি ইউরো (প্রায় ১১৬ কোটি মার্কিন ডলার) তহবিল বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ডিজিটাল ব্যাকবোন অবকাঠামোর জন্য। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশীদারদের সঙ্গে “উন্নত কেবল কূটনীতি” গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবমেরিন কেবল প্রকল্পগুলো এখনো প্রধানত আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। এশিয়ার দিকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প—ফার নর্থ ফাইবার—ইউরোপ ও জাপানকে আর্কটিক হয়ে যুক্ত করবে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যায়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ানের কেবল সম্পর্ক এখনো সীমিত।

আসিয়ানের উদ্যোগ
আসিয়ানের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক কাঠামো ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে সাবমেরিন কেবল মেরামত ও স্থিতিস্থাপকতা জোরদারের নির্দেশিকা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে উন্নত নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে গঠিত হয়েছে সাবমেরিন কেবল বিষয়ক আসিয়ান ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং ২০২৫ সালে আসিয়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে একটি ধারণাপত্র গৃহীত হয়েছে, যেখানে ইচ্ছাকৃত কেবল ক্ষতিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে অগ্রগতি এখনো ধীর এবং কোনো কেবল দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আসিয়ানের এখনো আলাদা যৌথ অপারেশনাল ব্যবস্থা নেই।
আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা
আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সহযোগিতা বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে ২০২৩–২০২৭ সালের আসিয়ান–ইইউ কর্মপরিকল্পনা, ২০২৬ সালের ডিজিটাল কর্মপরিকল্পনা এবং ইইউ–সিঙ্গাপুর ডিজিটাল অংশীদারত্বের মতো অ-বাধ্যতামূলক কাঠামোর মাধ্যমে। এই ছড়িয়ে থাকা কাঠামো যেমন সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে, তেমনি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নতুন উদ্যোগের সুযোগও তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী লিন কুওক প্রস্তাব করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক কাঠামো থেকে অনুপ্রাণিত একটি “আসিয়ান নিয়মবিধি” তৈরি করার। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টারের ওপর ভিত্তি করে একটি আঞ্চলিক সমন্বয় কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে, যা যৌথ হুমকি মূল্যায়ন এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় কাজ করবে।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো আসিয়ান–ইইউ যৌথ মেরামত সক্ষমতা ভাগাভাগি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিকল্পিত কেবল মেরামত জাহাজের রিজার্ভ বহর আসিয়ান অংশীদারদের জন্যও ব্যবহারযোগ্য করা যেতে পারে।
সরবরাহ শৃঙ্খল সহযোগিতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আসিয়ানের অনেক দেশ চায় কেবল সরবরাহকারীর বৈচিত্র্য বজায় রাখতে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র–চীন দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়তে না হয়। ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো—বিশেষ করে ফ্রান্সের আলকাটেল সাবমেরিন নেটওয়ার্কস—বিশ্বের শীর্ষ কেবল নির্মাতা ও স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু বড় প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে।
এই বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোকে আরও কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া যেতে পারে, যেখানে রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং কেবল পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে সহযোগিতা রাজনৈতিক উত্তেজনার বদলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টিকে থাকতে সহজ হবে।

সামনে পথ
এই প্রস্তাবগুলো স্বীকার করে যে আসিয়ানের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের আসল মূল্য হলো তাদের পুরো মডেল গ্রহণ নয়, বরং এমন নিয়ন্ত্রক ও অপারেশনাল সরঞ্জাম সরবরাহ করা যা আসিয়ান দেশগুলো নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
মূল বিষয় হলো রাজনৈতিকভাবে সম্ভব এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর এমন ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা গড়ে তোলা। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ঘোষণাপত্র ও বিস্তৃত উদ্যোগকে বাস্তব আইনি ও কার্যকর প্রতিশ্রুতিতে রূপ দেওয়া—যাতে সমুদ্রতলের কেবল ডিজিটাল অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে, তার দুর্বলতা নয়।
বারবোরা ভ্যালোকোভা সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির এশিয়া অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন সেন্টারের গবেষণা ফেলো।
বারবোরা ভ্যালোকোভা 



















