০৭:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করতে বিরল সফরে মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ফিলিপাইনের স্কুলে বন্দুক হামলায় নিহত অন্তত তিন, বন্দুকধারীও নিহত উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে জুমার নামাজের সময় বিস্ফোরণ, নিহত ১৬ রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো বন্ধের আহ্বান, মালয়েশিয়াকে সতর্ক করল ফরটিফাই রাইটস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে যাত্রীদের হাতাহাতি, ভিডিও ভাইরাল এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হকি ম্যাচে ভুলে বাজল উত্তর কোরিয়ার সংগীত আরাকানে রোহিঙ্গাদের ভূমি দখল নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিবেদনে নতুন তথ্য রাখাইনে সিত্তওয়ে ঘিরে মিয়ানমার সেনার হামলা, দুই নৌকা ধ্বংস রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণ ‘দ্য হোলস’-এ পুরুষের একাকিত্বের অন্ধকারে ঢুকছেন ম্যাক্স উলফ ফ্রিডলিখ

গুয়াহাটির কিশোর মায়াঙ্ক ইতিহাস গড়ল, উত্তর–পূর্ব ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার

ভারতের দাবা ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করলেন গুয়াহাটির ১৬ বছর বয়সি কিশোর মায়াঙ্ক। তিনি উত্তর–পূর্ব ভারতের প্রথম দাবা গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। দীর্ঘ সংগ্রাম, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং নানা লজিস্টিক সমস্যার মধ্য দিয়েও নিজের স্বপ্নের পেছনে নিরলস ছুটে শেষ পর্যন্ত এই বড় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহু বাধা ও ত্যাগের গল্প। মায়াঙ্কের মা মোনোমিতা চক্রবর্তী মনে করেন, কোভিড মহামারির সময় প্রায় ২০ মাস কোনও টুর্নামেন্টে অংশ নিতে না পারা তার ছেলের অগ্রযাত্রাকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছিল।

সুইডেনে সাফল্যের মুহূর্ত

শনিবার সুইডেনে অনুষ্ঠিত ‘হোটেল স্টকহোম নর্থ বাই ফার্স্ট হোটেলস ইয়াং ট্যালেন্টস’ প্রতিযোগিতা জিতে মায়াঙ্ক গ্র্যান্ডমাস্টারের মর্যাদা অর্জন করেন। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের ৯৪তম গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবেও ইতিহাসে নাম লেখান।

মায়াঙ্কের মা মোনোমিতা চক্রবর্তী বলেন, কোভিডের সময় প্রায় দুই বছর দাবা কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে ছিল। মাঝে মাঝে অনলাইন টুর্নামেন্ট খেললেও তাতে তেমন সুযোগ তৈরি হয়নি। তিনি প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে দেখতেন ছেলে মন খারাপ করে বাড়িতে বসে আছে।

মায়াঙ্কের ক্যারিয়ারের জন্য মোনোমিতা পরে রাজ্য সরকারের অধীনে গাইনোকোলজিস্টের চাকরি ছেড়ে দেন, যাতে তিনি ছেলের সঙ্গে সর্বক্ষণ ভ্রমণ করতে পারেন এবং তাকে সহায়তা করতে পারেন।

Mayank Continues Strong Show at SPS Guwahati India Open Chess Tournament

 

প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা

গুয়াহাটিতে বসবাস করায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পাওয়া সহজ ছিল না। মাঝে মাঝে গ্র্যান্ডমাস্টার সপ্তর্ষি রায়চৌধুরী এবং স্বয়মস মিশ্র কয়েকদিনের জন্য গুয়াহাটিতে এসে মায়াঙ্ককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

বড় শহরের দাবা প্রতিভাদের মতো সুযোগ তার ছিল না। বিদেশে কোনও টুর্নামেন্টে অংশ নিতে গেলেই তাকে আগে দিল্লি বা কলকাতায় যেতে হতো ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য। তারপর সেখান থেকে সংযোগ ফ্লাইটে অন্য দেশে পৌঁছাতে হতো।

স্বয়মস মিশ্র, যিনি অনেক দাবা প্রতিভাকে গ্র্যান্ডমাস্টারে রূপ দিতে সাহায্য করেছেন, মায়াঙ্কের প্রতিভা নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে মায়াঙ্কের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।

তার মতে, মায়াঙ্কের আক্রমণাত্মক খেলার দক্ষতা অসাধারণ এবং তা ২৬০০ রেটিংধারী খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনীয়, যদিও তার বর্তমান রেটিং ২৪৭৮। তিনি বলেন, মায়াঙ্কের আক্রমণাত্মক কৌশল এবং জটিল অবস্থান সামলানোর ক্ষমতা স্বাভাবিক প্রতিভার পরিচয় দেয়।

প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে মূলত তার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই কাজ করা হয়েছিল—বিশেষ করে যাতে সে নিজের চেয়ে উচ্চ রেটিংধারী খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পারে।

গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার কঠিন পথ

গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পথ যে কোনও দাবাড়ুর জন্যই কঠিন, কিন্তু মায়াঙ্কের জন্য তা ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।

২০২৩ সালে মহারাষ্ট্র জিএম ওপেনে তিনি প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম অর্জন করেন, একইসঙ্গে পান প্রথম আন্তর্জাতিক মাস্টার নর্ম। তখন মনে হয়েছিল তার পথ কিছুটা সহজ হয়ে গেছে।

কিন্তু এরপরও নানা নিয়ম ও পরিস্থিতির কারণে তাকে বারবার হতাশ হতে হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, গত বছর শারজাহ মাস্টার্স বি টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেও তিনি গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম পাননি, কারণ টুর্নামেন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্র্যান্ডমাস্টারের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাননি—যা এই মর্যাদা অর্জনের জন্য একটি বাধ্যতামূলক শর্ত।

মোনোমিতা চক্রবর্তী বলেন, গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম পাওয়া যেন প্রায় অলৌকিক ঘটনার মতো। অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়—তিনজন গ্র্যান্ডমাস্টারের বিরুদ্ধে খেলতে হয়, তিনটি ভিন্ন দেশের খেলোয়াড় থাকতে হয়, প্রতিপক্ষদের গড় রেটিং নির্দিষ্ট মানের হতে হয়। সব কিছু একসঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

তিনি আরও জানান, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষক না থাকায় অনেক সময় মায়াঙ্ককে ভারতের ছোট টুর্নামেন্টে খেলতে হয়েছে। সেখানে জেতা পুরস্কারের অর্থ দিয়েই বিদেশে বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খরচ চালাতে হয়েছে।

Seventeen-year-old chess prodigy Mayank Chakraborty becomes North East's  first chess Grandmaster

স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত

অবশেষে সুইডেনের এক ছোট শহরে সেই বহুদিনের প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এসে পৌঁছায়। মায়াঙ্কের পরিবারের জন্য এটি ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত এক বড় সাফল্য।

এখন তাদের আশা, এই একটি সাফল্য উত্তর–পূর্ব ভারতের আরও অনেক তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে এবং এই অঞ্চল থেকেও ভবিষ্যতে আরও বড় দাবা তারকা উঠে আসবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করতে বিরল সফরে মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা

গুয়াহাটির কিশোর মায়াঙ্ক ইতিহাস গড়ল, উত্তর–পূর্ব ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার

০৩:০৪:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

ভারতের দাবা ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করলেন গুয়াহাটির ১৬ বছর বয়সি কিশোর মায়াঙ্ক। তিনি উত্তর–পূর্ব ভারতের প্রথম দাবা গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। দীর্ঘ সংগ্রাম, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং নানা লজিস্টিক সমস্যার মধ্য দিয়েও নিজের স্বপ্নের পেছনে নিরলস ছুটে শেষ পর্যন্ত এই বড় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহু বাধা ও ত্যাগের গল্প। মায়াঙ্কের মা মোনোমিতা চক্রবর্তী মনে করেন, কোভিড মহামারির সময় প্রায় ২০ মাস কোনও টুর্নামেন্টে অংশ নিতে না পারা তার ছেলের অগ্রযাত্রাকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছিল।

সুইডেনে সাফল্যের মুহূর্ত

শনিবার সুইডেনে অনুষ্ঠিত ‘হোটেল স্টকহোম নর্থ বাই ফার্স্ট হোটেলস ইয়াং ট্যালেন্টস’ প্রতিযোগিতা জিতে মায়াঙ্ক গ্র্যান্ডমাস্টারের মর্যাদা অর্জন করেন। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের ৯৪তম গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবেও ইতিহাসে নাম লেখান।

মায়াঙ্কের মা মোনোমিতা চক্রবর্তী বলেন, কোভিডের সময় প্রায় দুই বছর দাবা কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে ছিল। মাঝে মাঝে অনলাইন টুর্নামেন্ট খেললেও তাতে তেমন সুযোগ তৈরি হয়নি। তিনি প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে দেখতেন ছেলে মন খারাপ করে বাড়িতে বসে আছে।

মায়াঙ্কের ক্যারিয়ারের জন্য মোনোমিতা পরে রাজ্য সরকারের অধীনে গাইনোকোলজিস্টের চাকরি ছেড়ে দেন, যাতে তিনি ছেলের সঙ্গে সর্বক্ষণ ভ্রমণ করতে পারেন এবং তাকে সহায়তা করতে পারেন।

Mayank Continues Strong Show at SPS Guwahati India Open Chess Tournament

 

প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা

গুয়াহাটিতে বসবাস করায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পাওয়া সহজ ছিল না। মাঝে মাঝে গ্র্যান্ডমাস্টার সপ্তর্ষি রায়চৌধুরী এবং স্বয়মস মিশ্র কয়েকদিনের জন্য গুয়াহাটিতে এসে মায়াঙ্ককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

বড় শহরের দাবা প্রতিভাদের মতো সুযোগ তার ছিল না। বিদেশে কোনও টুর্নামেন্টে অংশ নিতে গেলেই তাকে আগে দিল্লি বা কলকাতায় যেতে হতো ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য। তারপর সেখান থেকে সংযোগ ফ্লাইটে অন্য দেশে পৌঁছাতে হতো।

স্বয়মস মিশ্র, যিনি অনেক দাবা প্রতিভাকে গ্র্যান্ডমাস্টারে রূপ দিতে সাহায্য করেছেন, মায়াঙ্কের প্রতিভা নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে মায়াঙ্কের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।

তার মতে, মায়াঙ্কের আক্রমণাত্মক খেলার দক্ষতা অসাধারণ এবং তা ২৬০০ রেটিংধারী খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনীয়, যদিও তার বর্তমান রেটিং ২৪৭৮। তিনি বলেন, মায়াঙ্কের আক্রমণাত্মক কৌশল এবং জটিল অবস্থান সামলানোর ক্ষমতা স্বাভাবিক প্রতিভার পরিচয় দেয়।

প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে মূলত তার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই কাজ করা হয়েছিল—বিশেষ করে যাতে সে নিজের চেয়ে উচ্চ রেটিংধারী খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পারে।

গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার কঠিন পথ

গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পথ যে কোনও দাবাড়ুর জন্যই কঠিন, কিন্তু মায়াঙ্কের জন্য তা ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।

২০২৩ সালে মহারাষ্ট্র জিএম ওপেনে তিনি প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম অর্জন করেন, একইসঙ্গে পান প্রথম আন্তর্জাতিক মাস্টার নর্ম। তখন মনে হয়েছিল তার পথ কিছুটা সহজ হয়ে গেছে।

কিন্তু এরপরও নানা নিয়ম ও পরিস্থিতির কারণে তাকে বারবার হতাশ হতে হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, গত বছর শারজাহ মাস্টার্স বি টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেও তিনি গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম পাননি, কারণ টুর্নামেন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্র্যান্ডমাস্টারের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাননি—যা এই মর্যাদা অর্জনের জন্য একটি বাধ্যতামূলক শর্ত।

মোনোমিতা চক্রবর্তী বলেন, গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম পাওয়া যেন প্রায় অলৌকিক ঘটনার মতো। অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়—তিনজন গ্র্যান্ডমাস্টারের বিরুদ্ধে খেলতে হয়, তিনটি ভিন্ন দেশের খেলোয়াড় থাকতে হয়, প্রতিপক্ষদের গড় রেটিং নির্দিষ্ট মানের হতে হয়। সব কিছু একসঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

তিনি আরও জানান, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষক না থাকায় অনেক সময় মায়াঙ্ককে ভারতের ছোট টুর্নামেন্টে খেলতে হয়েছে। সেখানে জেতা পুরস্কারের অর্থ দিয়েই বিদেশে বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খরচ চালাতে হয়েছে।

Seventeen-year-old chess prodigy Mayank Chakraborty becomes North East's  first chess Grandmaster

স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত

অবশেষে সুইডেনের এক ছোট শহরে সেই বহুদিনের প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এসে পৌঁছায়। মায়াঙ্কের পরিবারের জন্য এটি ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত এক বড় সাফল্য।

এখন তাদের আশা, এই একটি সাফল্য উত্তর–পূর্ব ভারতের আরও অনেক তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে এবং এই অঞ্চল থেকেও ভবিষ্যতে আরও বড় দাবা তারকা উঠে আসবে।