মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এমন খবর ছড়িয়েছে যে ইরান নাকি হরমুজ প্রণালী দিয়ে কিছু তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে পারে, যদি সেই তেলের লেনদেন চীনের মুদ্রা ইউয়ানে করা হয়। তবে চীনের বিশ্লেষকেরা এই পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন এবং এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউয়ানের ব্যবহার প্রতীকীভাবে বাড়াতে এই পরিকল্পনা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। পাশাপাশি এটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে যায়। কিন্তু গত মাসের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনায় এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ অবরোধের কথা অস্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। একই সময়ে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানি ড্রোন ও সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালী এবং পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এটি একদিকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল।

নতুন নেতৃত্বের অবস্থান
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালী অবরোধের অবস্থান বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বক্তব্যে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার কৌশল অবশ্যই ব্যবহার করা হবে।
এদিকে এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান সীমিত সংখ্যক তেলবাহী জাহাজকে প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে, তবে শর্ত হলো—তেলের লেনদেন করতে হবে ইউয়ানে।
বাস্তবায়নের জটিলতা নিয়ে চীনা বিশ্লেষকদের সতর্কতা
বেইজিংয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক গং জিয়ং বলেন, প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন। বিশেষ করে নিশ্চিত করা কঠিন হবে যে লেনদেন সত্যিই ইউয়ানে হচ্ছে কিনা।
তিনি মনে করেন, চীন ও ইরানের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়া বেশি কার্যকর হতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থা হতে পারে যেখানে চীনের তেলবাহী জাহাজগুলো বাধা ছাড়া প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারবে।

তবে তিনি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, কোনো জাহাজ যদি ইরানের ইউয়ান লেনদেনের শর্ত মেনে চলেও, তবুও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বাহিনীর হামলার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে না।
আরেকটি সমস্যা হলো, যদি হামলায় ইরানের তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে রপ্তানিযোগ্য তেলের পরিমাণ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য তেল উৎপাদক দেশগুলো ইউয়ানে লেনদেন মেনে নিতে নাও চাইতে পারে।
ভূরাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা
রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ওয়াং ইওয়েই মনে করেন, ইউয়ানে লেনদেনের বিনিময়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে। তার মতে, সম্পূর্ণ অবরোধের চেয়ে এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মহলে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে চীন আরও বড় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ওয়াংয়ের মতে, ব্যাপক তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও পুরো বিশ্বকে এর মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে না। তাই কোনো না কোনো পথ খুলে দেওয়ার প্রয়োজন তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে তেল লেনদেনে ইউয়ানের ব্যবহার হলে যুক্তরাষ্ট্র তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ফলে এটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার উভয়ের জন্যই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

প্রতীকী লাভ বনাম রাজনৈতিক ঝুঁকি
চীনা সরকারের ঘনিষ্ঠ এক পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই পরিকল্পনা ইউয়ানে লেনদেনকে কিছুটা উৎসাহিত করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তার মতে, বিশ্বে অধিকাংশ তেল বাণিজ্য এখনও ইউয়ানে হয় না। ফলে কোনো দেশ বা কোম্পানি যদি ইরানের শর্ত মেনে ইউয়ানে লেনদেন করে হরমুজ প্রণালী পার হয়, তাহলে তা রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পাল্টা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
অন্যদিকে শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিন লিন বোচিয়াং তুলনামূলকভাবে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যদি লেনদেনের পদ্ধতি যাচাই করা সম্ভব হয়, তাহলে প্রযুক্তিগতভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব।
তার মতে, ইউয়ানে লেনদেনের বিনিময়ে জাহাজ চলাচল শুরু হলে পরবর্তীতে অন্য লেনদেনেও এর প্রভাব পড়তে পারে এবং স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক বাণিজ্যে কিছুটা ভারসাম্য আনতে পারে।

সংঘাতের প্রভাব তেলবাজারে
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহে বাধা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের খার্গ দ্বীপে অবস্থিত তেল রপ্তানি কেন্দ্রের প্রায় সব সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এসব হামলায় কোনো তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
নিরাপত্তা এড়াতে জাহাজের কৌশল
এদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি জাহাজ তাদের সামুদ্রিক ট্রান্সপন্ডারে “চীনা মালিকানাধীন” সংকেত সম্প্রচার করছে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, চীনের নিরপেক্ষ অবস্থানের সুবিধা নিতে এবং সম্ভাব্য হামলা এড়াতে জাহাজগুলো এই কৌশল ব্যবহার করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















