দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ পূর্ব এশিয়ায় সাময়িক সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি করতে পারে, যা চীন ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সামরিক সম্পদ স্থানান্তরের ক্ষমতা রাখে।
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সরানোর সিদ্ধান্ত
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা তাদের টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জড়িত।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোও শুরু করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া পরোক্ষভাবে এই পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কৌশল দুর্বল করবে না। তবে তিনি স্বীকার করেন যে এ বিষয়ে সিউলের মতামত শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব পায়নি।
তিনি বলেন, আমরা আপত্তি জানিয়েছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের অবস্থান পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা কাঠামোতে থাড ও প্যাট্রিয়টের ভূমিকা
থাড এবং প্যাট্রিয়ট—এই দুই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দক্ষিণ কোরিয়ার বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো সম্ভাব্য শত্রু, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার জন্য ব্যবহৃত হয়।
থাড মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে তাদের শেষ পর্যায়ের উড্ডয়নে উচ্চতায় ধ্বংস করার জন্য তৈরি। সাধারণত ৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় এটি কাজ করে এবং এটি উচ্চস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কাজ তুলনামূলক কম উচ্চতায়, প্রায় ১৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার উচ্চতায়। এটি সেই সব ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করে, যেগুলো উচ্চস্তরের প্রতিরক্ষা ভেদ করে নিচে নেমে আসে।
চীনের আপত্তি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা
২০১৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড মোতায়েনের সময় চীন তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল। বেইজিং মনে করে, এই ব্যবস্থার শক্তিশালী রাডার চীনের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর নজরদারি করতে পারে এবং এটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

এ কারণে সে সময় চীন দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ খারাপ হয়ে যায়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে থাড সরিয়ে নেওয়া বেইজিং ও সিউলের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া ইতিবাচক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও আঞ্চলিক কৌশল
মালয়েশিয়ায় অবস্থিত নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বেঞ্জামিন বার্টন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি থাড সরিয়ে নেয়, তবে দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এতে পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চীনের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলে শক্ত উপস্থিতি ধরে রাখতে অনিচ্ছা দেখায়।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এই দুটি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার ফলে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সাময়িক ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
প্যাট্রিয়টের শূন্যতা কিছুটা পূরণ করতে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব তৈরি মাঝারি পাল্লার চেওনগুং-টু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দেশটির দীর্ঘপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা অনেকেই কোরিয়ান থাড নামে উল্লেখ করেন, সেটি ২০২৭ সালের আগে পুরোপুরি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নাম আন্তর্জাতিক গবেষণা বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক কলিন কোহ বলেন, এই স্থানান্তর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির শেষ নয়, তবে কোরীয় উপদ্বীপে স্বল্পমেয়াদে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি ফাঁক তৈরি করবে।
তার মতে, চীন ও উত্তর কোরিয়ার জন্য এটি ইতিবাচক বার্তা হতে পারে। কিন্তু এ অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর কাছে এটি এমন সংকেত দিতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাপী সামরিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা
ওয়াশিংটনের হাডসন ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্যাট্রিক ক্রোনিন বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড বা প্যাট্রিয়ট সরানো দেখায় যে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব সীমিত সংখ্যায় রয়েছে। একাধিক সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে এগুলোর চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সামরিক প্রয়োজনের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে এটি দেখায় যে প্রয়োজনে এশিয়ায় অবস্থানরত বাহিনীকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত পাঠানোর সক্ষমতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়া জোটের নতুন কৌশল
এই পদক্ষেপ এমন সময় নেওয়া হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক জোটকে নতুনভাবে আধুনিকায়নের চেষ্টা চলছে। এর লক্ষ্য শুধু উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলা নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতেও এই জোটকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, পূর্ব এশিয়ার তথাকথিত প্রথম দ্বীপমালা রক্ষায় মিত্র দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপমালা জাপান থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর মধ্যে তাইওয়ানও রয়েছে, যাকে চীন নিজের অংশ বলে দাবি করে।
চীনের কৌশলগত হিসাব
পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের তাইওয়ান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিন লি ইহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন মোতায়েনকে প্রভাবিত করতে পারে।
তার মতে, তাইওয়ান প্রণালিতে চীনের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমে যায়, তবে বেইজিং কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। যদিও তিনি আবারও বলেছেন, শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনই চীনের পছন্দের পথ।

মার্কিন সামরিক চাপ ও সম্ভাব্য সুযোগ
হাডসন ইনস্টিটিউটের গবেষক লিসেলোটে ওডগার্ড বলেন, চীন এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ বাড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ বাড়ানোর সাময়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জোট এবং দ্রুত সামরিক শক্তি জড়ো করার ক্ষমতা এখনও শক্তিশালী। তাই তাইওয়ান নিয়ে কোনো সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই তাদের নৌ ও বিমান শক্তি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করতে পারবে।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাদের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















